মণিপুরের উখরুল জেলার লিতান গ্রামে রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) কুকি ও নাগা সম্প্রদায়ের মধ্যে মারামারির ফলে অন্তত তেইশটি বাড়ি পুড়েছে। সংঘাতের সূচনা হয় যখন নাগা গোষ্ঠীর একজন যুবকের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে, যা একই সন্ধ্যা থেকেই দুই গোষ্ঠীর মধ্যে হিংসাত্মক মুখোমুখি তৈরি করে।
স্থানীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে টিয়ার গ্যাস ছুঁড়ে দাঙ্গাকারীদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। গুলির আওয়াজের একাধিক রাউন্ড শোনা যায়, যা ভারতের বার্তা সংস্থা পিটিআইর তথ্য অনুযায়ী ঘটেছে।
বিকেল ছয়টা পর্যন্ত নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি বাড়িয়ে তোলা হয় এবং গুলির শব্দ শোনা যায়। গুলির সাড়া দিয়ে নিরাপত্তা বাহিনী টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করে দাঙ্গাকারীদের বিচ্ছিন্ন করতে উদ্যোগ নেয়।
বিকালের সাতটায় লিতান ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় ১৪৪ ধারার অধীনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। নিরাপত্তা বাহিনীর একটি বিবৃতিতে বলা হয়, উচ্চতর নির্দেশ না আসা পর্যন্ত ১৪৪ ধারার বিধান বজায় থাকবে।
রাতের মাঝামাঝি সময়ে পরিস্থিতি পুনরায় উত্তেজিত হয়। কুকি গোষ্ঠীর কিছু বিদ্রোহী নাগা সম্প্রদায়ের বাড়িগুলোতে আগুন জ্বালায়, যার ফলে অন্তত তেইশটি বাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়। অগ্নিকাণ্ডের ফলে বহু পরিবার তাত্ক্ষণিকভাবে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।
মণিপুর রাজ্য পুলিশ প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা জানান, লিতান গ্রাম ও তার আশেপাশের এলাকায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনও অস্থির। সম্ভাব্য উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত সেনাবাহিনীর দল মোতায়েন করা হয়েছে এবং ক্ষয়ক্ষতির হিসাব কষা চলছে।
অগ্নিকাণ্ডের পর ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িগুলোর পরিমাণ ও পুনর্বাসনের প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণে স্থানীয় প্রশাসন দ্রুত কাজ করছে। প্রাথমিক রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে যে, পুড়িয়ে দেওয়া বাড়িগুলোতে বেশিরভাগই নাগা সম্প্রদায়ের সদস্যের মালিকানায় ছিল।
মণিপুর উত্তর-পূর্ব ভারতের একটি বহুমুখী জাতিগত রাজ্য, যেখানে বহু সম্প্রদায় ঐতিহাসিকভাবে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রেখেছে। তবে ২০২৩ সালের মে মাসে রাজ্যের দুই বৃহৎ নৃগোষ্ঠী—হিন্দু ধর্মাবলম্বী মেইতেই এবং খ্রিস্টান কুকি—মধ্যে বিশাল দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে।
সেই দাঙ্গায় দুই গোষ্ঠীর মধ্যে প্রায় দুইশত পঞ্চাশের বেশি মানুষ নিহত হয় এবং আরও অসংখ্য মানুষ আহত হয়। সংঘাতের তীব্রতা এবং নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার ফলে ২০২৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বীরেন সিং পদত্যাগ করেন এবং মণিপুরে রাষ্ট্রপতির শাসন আরম্ভ হয়।
প্রায় এক বছর পর, ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ বিজেপির জ্যেষ্ঠ নেতা ইউমনাম খেমচাঁদ সিংকে নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়া হয়। নতুন সরকারের দায়িত্ব হল অব্যাহত উত্তেজনা শমন, পুনরুদ্ধার কাজ ত্বরান্বিত করা এবং আইনশৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।
বর্তমান দাঙ্গা নিয়ে তদন্তের দায়িত্ব রাজ্য পুলিশ ও কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার হাতে। গুলির ব্যবহার, অগ্নিকাণ্ডের কারণ এবং দাঙ্গার মূল চালিকাশক্তি নির্ধারণের জন্য ফরেনসিক বিশ্লেষণ চালু করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সম্ভাবনা প্রকাশ করা হয়েছে, এবং নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি বাড়িয়ে পুনরায় এমন ঘটনা রোধের জন্য সতর্কতা জারি করা হয়েছে।



