ইরিত্রিয়া এবং ইথিওপিয়া দু’দেশের মধ্যে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক সংঘর্ষে ইথিওপিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রী ইরিত্রিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রীর কাছে একটি চিঠি প্রেরণ করে ইরিত্রিয়ার সৈন্যদের ইথিওপিয়ার ভূখণ্ড থেকে প্রত্যাহার করার আহ্বান জানিয়েছেন। চিঠিতে ইরিত্রিয়ার সৈন্যদের উত্তরের সীমান্তে অনুপ্রবেশ এবং ইথিওপিয়ার উত্তর-পশ্চিমে বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে যৌথ সামরিক অনুশীলনকে ‘সরাসরি আগ্রাসন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এছাড়া ইরিত্রিয়া ইথিওপিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় ইথিওপিয়ার সেনাবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে টিগ্রায়ের বিরোধী বাহিনীর সমর্থন করলেও, এখন উভয় দেশের সম্পর্ক পুনরায় খারাপের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
ইরিত্রিয়া এই অভিযোগকে সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে খণ্ডন করেছে এবং ইথিওপিয়ার চিঠিতে উল্লিখিত ‘আক্রমণাত্মক কার্যক্রম’কে দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চালিয়ে আসা শত্রুতার ধারার অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছে। ইরিত্রিয়ার পক্ষ থেকে প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইথিওপিয়ার এই দাবিগুলি কেবলমাত্র রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণের জন্য গড়ে তোলা এবং বাস্তবিক কোনো সামরিক হস্তক্ষেপের ভিত্তি নেই।
উভয় দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ার পেছনে ১৯৯৮ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে সংঘটিত সীমান্তযুদ্ধের স্মৃতি এখনও তাজা। ঐ যুদ্ধের ফলে ১০ লক্ষেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল এবং যদিও ২০১৮ সালে ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ ইরিত্রিয়ার রাজধানী আসমারায় ভ্রমণ করে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেন, তবে চুক্তি সম্পূর্ণভাবে কার্যকর হয়নি।
ইতিহাসে দু’দেশের সম্পর্কের উত্থান-পতন স্পষ্ট, বিশেষ করে ইথিওপিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় ইরিত্রিয়া ইথিওপিয়ার সেনাবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে টিগ্রায়ের বিরোধী বাহিনীর সমর্থন করেছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ইরিত্রিয়া এবং ইথিওপিয়ার মধ্যে পুনরায় মতবিরোধ দেখা দিয়েছে, যা উভয় দেশের কূটনৈতিক নীতি ও নিরাপত্তা কৌশলে প্রভাব ফেলছে।
ইথিওপিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রীর চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, “সাম্প্রতিক কয়েক দিনের উন্নয়ন ইরিত্রিয়ার সরকারকে আরও উত্তেজনা বাড়ানোর পথে এগিয়ে নিয়েছে”। তিনি ইরিত্রিয়ার সৈন্যদের উত্তরের সীমান্তে অনুপ্রবেশকে কেবল প্ররোচনা নয়, বরং সরাসরি আক্রমণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এছাড়া, ইরিত্রিয়া ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীর যৌথ সামরিক অনুশীলনকে ইথিওপিয়ার নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ইথিওপিয়ার জন্য সমুদ্রপথে প্রবেশের অধিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বিষয়। প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ পূর্বে এই বিষয়কে জাতীয় অস্তিত্বের প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরেছেন এবং ইরিত্রিয়ার স্বাধীনতার পর ইথিওপিয়া একটি বন্দর হারানোর কথা উল্লেখ করে তা ‘ভুল’ বলে সমালোচনা করেছেন। সমুদ্রপথে প্রবেশের সুযোগ না পেলে ইথিওপিয়ার বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন সীমিত হতে পারে, তাই এই বিষয়টি উভয় দেশের কূটনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।
চিঠিতে ইরিত্রিয়ার সৈন্যদের প্রত্যাহার করা হলে দুই দেশ পুনরায় সংলাপ শুরু করতে পারে, যার মধ্যে সমুদ্রপথের প্রবেশের বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত থাকবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ইরিত্রিয়া এই শর্তে কোনো সাড়া দেয়নি, ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। উভয় পক্ষের মধ্যে সংলাপের সম্ভাবনা এখনো অনিশ্চিত, এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই উত্তেজনা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংস্থা ও আফ্রিকান ইউনিয়নের ভূমিকা এই মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ। উভয় দেশই আফ্রিকান মহাদেশের বৃহত্তম অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে বিবেচিত, এবং তাদের মধ্যে কোনো সামরিক সংঘাত পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যস্থতা ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান বাড়ছে।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন, যদি ইরিত্রিয়া ও ইথিওপিয়া দ্রুত সংলাপের মাধ্যমে সীমান্তে থাকা অবৈধ সৈন্যবাহিনী প্রত্যাহার না করে, তবে ভবিষ্যতে পুনরায় যুদ্ধের ঝুঁকি বাড়তে পারে। উভয় দেশের নেতৃত্বের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাসের অভাব এবং কূটনৈতিক ভুল বোঝাবুঝি এই উত্তেজনার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
সারসংক্ষেপে, ইথিওপিয়ার চিঠিতে ইরিত্রিয়ার সৈন্যদের প্রত্যাহার দাবি এবং ইরিত্রিয়ার তা অস্বীকারের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক উত্তেজনা নতুন পর্যায়ে পৌঁছেছে। সমুদ্রপথের প্রবেশের বিষয়, সীমান্তে সামরিক উপস্থিতি এবং দীর্ঘস্থায়ী শত্রুতার ইতিহাস এই সংঘাতকে জটিল করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সক্রিয় হস্তক্ষেপ এবং উভয় দেশের কূটনৈতিক ইচ্ছাশক্তি ছাড়া পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান করা কঠিন হতে পারে।



