সোমবার ভোর প্রায় ৪ টায় ইজরায়েলি সেনাবাহিনী দক্ষিণ লেবাননের হাসবাইয়া জেলার একটি বাড়ি থেকে আল-জামাআ আল-ইসলামিয়া দলের নেতা আতউই আতউইকে অপহরণ করেছে। অপহরণটি আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম করে করা হয়েছে বলে দলটি ইজরায়েলি সেনাবাহিনীর ওপর গুরুতর আক্রমণমূলক কাজের অভিযোগ তুলেছে। আতউই আতউই হিব্বারিয়েহ গ্রামের প্রাক্তন মেয়র ছিলেন, যার বাড়ি থেকে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
আল-জামাআ আল-ইসলামিয়া জানিয়েছে, ইজরায়েলি সেনাবাহিনীর এই অনুপ্রবেশ লেবাননের সার্বভৌমত্বের সরাসরি লঙ্ঘন এবং তা অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে। দলটি যুক্তি দিয়েছে যে হিজবুল্লাহর সঙ্গে সমন্বয়ে তারা ইজরায়েলের সঙ্গে চলমান সংঘাতে অংশগ্রহণের দায় স্বীকার করেছে এবং তাই ইজরায়েলি সেনাবাহিনীর লক্ষ্যবস্তু হয়ে থাকতে পারে।
২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তি সত্ত্বেও ইজরায়েলি সেনাবাহিনী দক্ষিণ লেবাননে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। চুক্তিতে ইজরায়েলকে লেবাননের ভূখণ্ড থেকে প্রত্যাহার করার কথা থাকলেও, ইজরায়েল এখনও কৌশলগত গুরুত্বের পাঁচটি এলাকা দখলে রেখেছে। এই অঞ্চলগুলোতে সামরিক অবকাঠামো এবং গোপনীয় স্থাপনাগুলি বজায় রয়েছে, যা যুদ্ধবিরতির শর্তের বিরোধী হিসেবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে।
চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা অনুযায়ী, হিজবুল্লাহকে সীমান্ত থেকে প্রায় ২৭ কিলোমিটার উত্তরে লিতানি নদীর দক্ষিণাঞ্চল থেকে প্রত্যাহার করতে এবং সেখানে থাকা সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করতে বলা হয়েছিল। তবে ইজরায়েলি সেনাবাহিনীর ধারাবাহিক উপস্থিতি এবং নতুন অপারেশনগুলো এই শর্তের বাস্তবায়নকে বাধাগ্রস্ত করছে বলে বিশ্লেষকরা মন্তব্য করছেন।
ইজরায়েলি সেনাবাহিনী একটি বিবৃতিতে জানিয়েছে, সাম্প্রতিক গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তারা একটি লক্ষ্যভিত্তিক অভিযান চালিয়ে একজন জ্যেষ্ঠ সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করেছে। গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তের জন্য ইজরায়েলের ভূখণ্ডে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং দলটির বিরুদ্ধে উত্তর ইজরায়েলে হামলা চালানোর অভিযোগ তোলা হয়েছে। সেনাবাহিনীর এই বক্তব্যে অপহরণকে একটি নিরাপত্তা অপারেশন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
লেবাননের জাতীয় সংবাদ সংস্থা (এনএনএ) অনুসারে, অপহরণটি সোমবার ভোর ৪ টার দিকে ঘটেছে এবং আতউই আতউইকে ইজরায়েলি সেনাবাহিনীর দলটি সরাসরি বাড়ি থেকে নিয়ে গিয়েছে। আতউই আতউই হিব্বারিয়েহ গ্রামের পূর্ব মেয়র ছিলেন, যার রাজনৈতিক প্রোফাইল এবং স্থানীয় প্রভাবের কারণে তিনি ইজরায়েলি সেনাবাহিনীর নজরে আসেন।
লেবানন সরকারও পূর্বে ইজরায়েলকে বহু লেবানিজ নাগরিককে অপহরণ করার অভিযোগ তুলেছে। হিজবুল্লাহর সংসদ সদস্য হুসেইন হাজ্জ হাসান সম্প্রতি উল্লেখ করেছেন, ইজরায়েল বর্তমানে ২০ জন লেবানিজ বন্দিকে আটক করে রেখেছে, যার মধ্যে অন্তত ১০ জনকে যুদ্ধবিরতির পর লেবাননের অভ্যন্তর থেকে অপহরণ করা হয়েছে। এই তথ্যগুলো লেবাননের নিরাপত্তা ও মানবিক অবস্থার উপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে।
একই দিনে, দক্ষিণ লেবাননে ইজরায়েলি বিমান হামলায় তিনজন নিহত হয়েছে, যার মধ্যে একটি শিশুও অন্তর্ভুক্ত। এনএনএর তথ্য অনুযায়ী, তায়র জেলার ইয়ানুহ শহরের কেন্দ্রস্থলে একটি গাড়িকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়, যার ফলে তিনজনের মৃত্যু হয়। এই হামলা স্থানীয় জনগণের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো থেকে তীব্র নিন্দা পেয়েছে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে, জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সূত্রগুলো ইজরায়েলকে সীমান্ত লঙ্ঘন বন্ধ করতে এবং যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্ত মেনে চলতে আহ্বান জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন, ইজরায়েলি সেনাবাহিনীর ধারাবাহিক অপারেশনগুলো লেবাননের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ভারসাম্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে, জাতিসংঘের শান্তি রক্ষাকারী মিশন (UNIFIL)কে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপের জন্য প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে।
পরবর্তী সপ্তাহে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে লেবানন-ইজরায়েল সংঘাত সংক্রান্ত একটি বিশেষ সেশন অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে উভয় পক্ষের অবস্থান শোনা হবে এবং যুদ্ধবিরতি চুক্তির বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণের জন্য অতিরিক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের সম্ভাবনা আলোচনা হবে। বিশ্লেষকরা আশা করছেন, এই সেশনের ফলাফল লেবাননের ভূখণ্ডে ইজরায়েলি সেনাবাহিনীর উপস্থিতি সীমিত করার এবং অপহরণকৃত ব্যক্তিদের মুক্তির দিকে একটি স্পষ্ট পথনির্দেশ দিতে পারে।



