উপদেষ্টা পরিষদ গত রাতে বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রতিনিধিত্বকারী দলকে অনুমোদন প্রদান করেছে, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের ভিত্তি স্থাপন করে। চুক্তিটি রাত ৯টায় আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হবে এবং উভয় দেশের গার্মেন্টস শিল্পে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করবে। এই পদক্ষেপটি বাংলাদেশ ব্যাংকের রপ্তানি অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে।
চুক্তির মূল শর্ত হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা তুলা ব্যবহার করে তৈরি করা গার্মেন্ট পণ্যগুলোকে কোনো শুল্ক আরোপ না করে মার্কিন বাজারে বিক্রি করা যাবে। উভয় পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক শুল্কের সম্পূর্ণ অবসান নিশ্চিত করা হয়েছে, ফলে রপ্তানিকারকরা সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতাদের সঙ্গে ব্যবসা করতে পারবে। এই সুবিধা বিশেষভাবে সেইসব কোম্পানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ, যারা পূর্বে নির্দিষ্ট পরিমাণে মার্কিন উপকরণ ব্যবহার না করলে উচ্চ শুল্কের মুখোমুখি হতো।
পূর্বে বাংলাদেশ ব্যাংকের গার্মেন্ট রপ্তানিতে কার্যকর শুল্কহার প্রায় ৩৬.৫ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতো, যা মূল শুল্ক ও পাল্টা শুল্কের সমষ্টি। শুল্কমুক্ত চুক্তি এই হারকে শূন্যে নামিয়ে আনবে, ফলে রপ্তানিকারকদের খরচে উল্লেখযোগ্য সাশ্রয় হবে। বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, এই হ্রাস উৎপাদন খরচ কমিয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় দেশকে এগিয়ে নিতে পারে।
বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশ ব্যাংক গার্মেন্টস শিল্প দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানিকারক হিসেবে পরিচিত, এবং দেশের মোট রপ্তানি আয়ের একটি বড় অংশ গঠন করে। গার্মেন্ট রপ্তানির প্রায় তিন-চতুর্থাংশ তুলা ভিত্তিক, তাই তুলা ব্যবহার করে তৈরি পণ্যের ওপর শুল্কমুক্ত সুবিধা সরাসরি কাঁচামাল সংগ্রহ ও উৎপাদন কৌশলে পরিবর্তন আনবে। এই পরিবর্তন উৎপাদন চক্রকে দ্রুততর করে বাজারে প্রবেশের সময় কমাবে।
এ পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের গার্মেন্ট রপ্তানিকারকরা বিভিন্ন শুল্ক ও অ-শুল্ক বাধার সম্মুখীন হতেন। নতুন চুক্তি এই বাধাগুলোকে কার্যত দূর করে, ফলে রপ্তানিকারকরা মার্কিন ক্রেতাদের সঙ্গে সরাসরি দর কষাকষি করতে পারবে। দীর্ঘমেয়াদী আলোচনার পর এই চুক্তি কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে।
শিল্প বিশ্লেষকরা চুক্তিটিকে গার্মেন্ট সেক্টরের জন্য “গেম চেঞ্জার” বলে উল্লেখ করেন। শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার রপ্তানিকারকদের উৎপাদন খরচ কমিয়ে প্রতিযোগিতামূলক ক্ষমতা বাড়াবে, ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতাদের কাছ থেকে অর্ডারের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়া, রপ্তানিকারকরা নতুন বাজারে পণ্য পরিচয় করিয়ে আরও বৈচিত্র্যময় গ্রাহক ভিত্তি গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।
শুল্কমুক্ত সুবিধা বিশেষভাবে ছোট ও মাঝারি আকারের গার্মেন্ট কোম্পানিগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ, যাদের পূর্বে উচ্চ শুল্কের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ কঠিন ছিল। এখন তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৃহৎ ক্রয়ক্ষমতা ব্যবহার করে উৎপাদন পরিমাণ বাড়াতে পারবে, যা সরাসরি কর্মসংস্থান ও রপ্তানি আয় বৃদ্ধি করবে। এই প্রবাহের ফলে গার্মেন্ট শিল্পের মোট রপ্তানি আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
দীর্ঘমেয়াদে এই চুক্তি বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পকে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে আরও দৃঢ় অবস্থানে নিয়ে যাবে। শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার নতুন প্রযুক্তি ও ডিজাইন উন্নয়নের জন্য অতিরিক্ত মূলধন সরবরাহের সম্ভাবনা তৈরি করবে, যা পণ্যের মান ও বৈচিত্র্য বাড়াবে। ফলে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি অন্যান্য উন্নত বাজারেও বাংলাদেশ ব্যাংকের পণ্যগুলোর চাহিদা বাড়তে পারে।
কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই চুক্তি দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে নতুন স্তরে নিয়ে যাবে। উভয় পক্ষের সরকার এই চুক্তিকে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করছে। ভবিষ্যতে অতিরিক্ত সেক্টরে সমন্বিত চুক্তির সম্ভাবনা উন্মুক্ত রয়েছে, যা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যকে আরও বিস্তৃত করবে।
সারসংক্ষেপে, শুল্কমুক্ত গার্মেন্ট চুক্তি বাংলাদেশ ব্যাংকের রপ্তানি কাঠামোকে পুনর্গঠন করবে, উৎপাদন খরচ কমাবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা দেবে। এই চুক্তি কেবল বাণিজ্যিক নয়, কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।



