ডা. শফিকুর রহমান, জামায়াত-এ-ইসলামির আমির, ৯ ফেব্রুয়ারি সোমবার সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিটে বাংলাদেশ টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে এক ভাষণ উপস্থাপন করেন। তিনি পরিবর্তন না হলে অপরাধের পথ অব্যাহত থাকবে, আর পরিবর্তন ঘটলে ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর অবৈধ সুবিধা শেষ হবে, এ বিষয়টি জোর দিয়ে বললেন।
ভাষণের সূচনায় তিনি জুলাই মাসে শহীদদের আত্মার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে স্মরণ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, জুলাইয়ের সংগ্রাম ছিল বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার এবং ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক ধারার পরিবর্তনের দাবিতে উত্থাপিত।
ডা. শফিকুর রহমানের মতে, দীর্ঘদিন ধরে মানবাধিকার, ভোটাধিকার ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষয়ক্ষতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদই এই আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি। তিনি যুক্তি দেন, আজকের তরুণ প্রজন্ম ‘নতুন বাংলাদেশ’ অথবা ‘বাংলাদেশ ২.০’ দেখতে চায়, যেখানে সমতা, স্বচ্ছতা ও উন্নয়ন প্রধান।
তবে তিনি উল্লেখ করেন, ক্ষমতায় থাকা একটি মহল এই পরিবর্তনের বিরোধিতা করছে। এই গোষ্ঠী পরিবর্তনের ফলে তাদের অবৈধ ও অপরাধমূলক কার্যক্রমের সুযোগ হ্রাস পাবে বলে ভয় পেয়ে বিরোধিতা করছে, এটাই তার মতে মূল কারণ।
ডা. শফিকুর রহমান তরুণদের সাহস, মেধা, প্রযুক্তি জ্ঞান ও নেতৃত্বের গুণাবলীকে প্রশংসা করে, এবং জুলাইয়ের মতোই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশ গড়ার আহ্বান জানান। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ভবিষ্যৎ গড়তে তরুণদেরই দায়িত্ব, এবং তাদের সমর্থন ছাড়া কোনো পরিবর্তন সম্ভব নয়।
রাষ্ট্র সংস্কারের দিকেও তিনি গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি স্বীকার করেন, বিপ্লব-পরবর্তী সরকার কিছু সংস্কার উদ্যোগ গ্রহণ করলেও অনেকগুলো অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। এই অসম্পূর্ণতা দূর করে স্থায়ী উন্নয়ন নিশ্চিত করতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের আয়োজন করা হয়েছে।
ডা. শফিকুর রহমান গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে, এই প্রক্রিয়াকে দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, এই ভোটের মাধ্যমে জনগণ সরাসরি রাষ্ট্রের দিকনির্দেশনা নির্ধারণের সুযোগ পাবে।
যদি জামায়াত-এ-ইসলামি শাসনে আসে, তবে রাষ্ট্র পরিচালনা সততা, ইনসাফ, সুশাসন ও জবাবদিহিতার ভিত্তিতে হবে, তিনি পুনরায় জোর দিয়ে বলেন। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, চাঁদাবাজি ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান গ্রহণের প্রতিশ্রুতি তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন।
নারী অধিকার নিয়ে তিনি বলেন, নারীর মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে সমাজের উন্নয়ন থেমে যাবে। জামায়াত-এ-ইসলামি শাসনে নারীরা সমাজের মূলধারার নেতৃত্বে সমান মর্যাদায় অংশ নেবে, এটাই তার আশ্বাস।
ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার সম্পর্কেও তিনি স্পষ্ট বার্তা দেন। বাংলাদেশ মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান—সবার দেশ, এবং কোনো ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কেউই নির্যাতনের শিকার হবে না, তিনি উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে তিনি তাবলিগ জামাতসহ বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠীর সঙ্গে সমন্বয় ও সহাবস্থানের গুরুত্বের কথাও উল্লেখ করেন।
ডা. শফিকুর রহমানের ভাষণ দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে নতুন দিকনির্দেশনা তৈরি করতে পারে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন। আসন্ন সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ফলাফল নির্ধারণ করবে, পরিবর্তনকে বাধা দেয়া গোষ্ঠীর প্রভাব কতটুকু থাকবে এবং জামায়াত-এ-ইসলামির শাসনকালের নীতি বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব হবে।
এই মুহূর্তে দেশের রাজনৈতিক দলগুলো ভোটারদের কাছে নিজেদের পরিকল্পনা উপস্থাপন করছে, এবং ডা. শফিকুর রহমানের আহ্বান ভোটারদের মধ্যে পরিবর্তনের প্রতি আগ্রহ বাড়াতে পারে। ভবিষ্যতে কীভাবে এই আহ্বান বাস্তবায়িত হবে, তা দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও শাসনব্যবস্থার গুণগত মানের ওপর নির্ভরশীল।



