রেহমান সোবহান, বাংলাদেশের প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারক, তার শৈশব থেকে বয়সের শেষ পর্যন্ত গৃহীত শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা তার পরবর্তী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সাত বছর বয়সে তাকে উত্তর ভারতের দার্জিলিংয়ের সেন্ট পলস স্কুলে পাঠানো হয়, যা একটি পুরনো বোর্ডিং প্রতিষ্ঠান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সেখানে পড়াশোনা করার ফলে খাবার ও অন্যান্য সুবিধা সীমিত ছিল, এবং ছাত্রদের জন্য নির্দিষ্ট দিনে গোসল ও রেশনিংয়ের ব্যবস্থা করা হতো।
শিক্ষা ছাড়াও সোবহান ফুটবল, হকি ও অ্যাথলেটিক্সে সক্রিয় ছিলেন, যা তার শারীরিক বিকাশে সহায়তা করে। পনেরো বছর বয়সে তিনি সিনিয়র ক্যামব্রিজ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে লাহোরের এইচ.এস.সি. কলেজে ভর্তি হন, যেখানে তার শিক্ষাজীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ শুরু হয়।
লাহোরে পড়াশোনার সময় রাজনীতি তার জীবনে বিশেষ গুরুত্ব পায় না; তিনি মূলত একাডেমিক দিকেই মনোনিবেশ করতেন। কলেজ শেষ করার পর তিনি যুক্তরাজ্যের ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং অর্থনীতির ওপর বিশেষজ্ঞতা অর্জন করেন। ক্যামব্রিজে থাকাকালীন তিনি ইউরোপীয় সমাজতান্ত্রিক, শ্রমিক আন্দোলন ও উপনিবেশবিরোধী রাজনৈতিক তত্ত্বের সঙ্গে পরিচিত হন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের লেবার সোসাইটি ও অন্যান্য বামপন্থী ছাত্রগোষ্ঠীর কার্যক্রমে অংশগ্রহণের ফলে তার রাজনৈতিক চেতনা গঠিত হয়। এই সময়ের আদর্শিক প্রভাব তার পরবর্তী কর্মজীবনে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়।
১৯৫৭ সালে, একুশ বছর বয়সে তিনি ঢাকায় ফিরে আসেন। তবে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে তার পরিচয় এখনও সম্পূর্ণ হয়নি; রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম বা বাংলা সাহিত্যের কোনো কাজ তিনি এখনও পড়েননি এবং ইলিশ মাছের স্বাদও পাননি।
প্রথম বিবাহে তিনি সালমা সোবহানের সঙ্গে যুক্ত হন, যিনি একজন আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী। উভয়ের পেশাগত স্বাধীনতা ও পারস্পরিক সম্মান তাদের পারিবারিক জীবনের ভিত্তি গঠন করে।
পরবর্তীতে তিনি অধ্যাপক রওনক জাহানের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। শিল্পকলা ও সঙ্গীতের প্রতি তার গভীর আগ্রহ থাকে; তিনি নিয়মিতভাবে পশ্চিমা ধ্রুপদী সঙ্গীত শোনেন এবং ভাস্কর নভেরার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব গড়ে তোলেন, যার সঙ্গে তিনি বিটোফেনের সিম্ফনি শোনার স্মৃতি ভাগ করেন।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সূচনায় রেহমান সোবহান, মুস্তাফা মনোয়ার এবং অধ্যাপক আনিসুর রহমানের সঙ্গে আগরতলা যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। পথে তিনি নতুন লুঙ্গি ও বেল্ট পরিধান করে এক লঞ্চে বাঙালিদের সন্দেহের মুখোমুখি হন, তবে সেখানকার সহায়তায় নিরাপদে পৌঁছান।
আগরতলা থেকে দিল্লি পর্যন্ত যাত্রা শেষে তিনি তাজউদ্দীন আহমদের পরিচয় ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে দেন, যার ফলে তাজউদ্দীনকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষার জন্য নিয়োগ করা হয়। সোবহানকে পরবর্তীতে দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরার দায়িত্ব দেওয়া হয়।
স্বাধীনতার পর তিনি বাংলাদেশে ফিরে নীতি নির্ধারণে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন এবং সরকারে বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পালন করেন। তার অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি দেশের অর্থনৈতিক নীতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।
আজ রেহমান সোবহানের জীবনকথা একটি আদর্শিক বাঙালির উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়, যেখানে শৈশবের কঠিন পরিস্থিতি, বিদেশি শিক্ষার প্রভাব এবং মুক্তিযুদ্ধের সক্রিয় অংশগ্রহণ একত্রে দেশের ভবিষ্যৎ গঠনে অবদান রাখে।



