লেবাননের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর ত্রিপোলিতে রবিবার সন্ধ্যায় সংলগ্ন দু’টি পুরনো আবাসিক ভবন একসঙ্গে ধসে পড়ে, ফলে তল্লাশি ও উদ্ধার কাজের পর মৃত্যুর সংখ্যা ১৪-এ বৃদ্ধি পায় এবং আটজন বাসিন্দা জীবিত অবস্থায় উদ্ধার হয়। ঘটনাস্থলটি রাজধানী বৈরুতের উত্তরে প্রায় ৮৫ কিলোমিটার দূরে, ভূমধ্যসাগরের তীরবর্তী বন্দর শহর, যেখানে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পুরনো কাঠামোর ধসে পড়া ঘটনা বাড়ছে।
দমকল বিভাগের মহাপরিচালক ইমাদ খ্রেইস জানান, ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসাবশেষে তল্লাশি চালিয়ে উদ্ধারকারী দল ১৪টি মৃতদেহ শনাক্ত করেছে এবং আটজনকে নিরাপদে বের করে নিয়ে গেছে। তিনি উল্লেখ করেন, ধ্বংসাবশেষের মধ্যে এখনও কিছু অংশ অনুসন্ধানাধীন, ফলে সম্পূর্ণ পরিসংখ্যান এখনও চূড়ান্ত নয়।
ত্রিপোলি নগর কর্তৃপক্ষের প্রধান আব্দুল হামিদ কারামেহ জানান, দু’টি ভবনে মোট ২২ জন বাসিন্দা ছিলেন, তবে কতজন এখনও নিখোঁজ তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। তিনি ত্রিপোলি মিউনিসিপ্যাল পরিষদের সঙ্গে সমন্বয় করে অতিরিক্ত অনুসন্ধান চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা প্রকাশ করেন।
স্থানীয় প্রশাসন ও দমকল বাহিনীর যৌথ প্রচেষ্টায় ত্রিপোলির বাসিন্দা ও স্বেচ্ছাসেবকরা উদ্ধার কাজে অংশগ্রহণ করে, তবে ধ্বংসাবশেষের বিশালতা ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে কাজটি কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। দমকল কর্মীরা জানান, ভবনগুলো বহু বছর ধরে রক্ষণাবেক্ষণহীন অবস্থায় ছিল, যা ধসে পড়ার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ত্রিপোলি শহরে সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক পুরনো কাঠামো ধসে পড়েছে, যা লেবাননের অবনতি ঘটমান অবকাঠামো ও দীর্ঘমেয়াদী অবহেলার স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে। বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, দেশের অর্থনৈতিক সংকট ও বৈদ্যুতিক জ্বালানি ঘাটতির ফলে নির্মাণ মানের হ্রাস ঘটেছে, যা ভবনের স্থায়িত্বকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা লেবাননের এই মানবিক সংকটকে বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত করে দেখছেন। একটি ইউএন মানবিক সংস্থা প্রতিনিধির মন্তব্যে বলা হয়েছে, ত্রিপোলির মতো বন্দর শহরে অবকাঠামো দুর্বলতা শুধুমাত্র স্থানীয় প্রাণহানিই নয়, বাণিজ্যিক কার্যক্রম ও শরণার্থী প্রবাহেও প্রভাব ফেলতে পারে। তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সম্ভাব্য আর্থিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন।
লেবাননের সরকারও এই ঘটনার পর দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানিয়ে, ধ্বংসপ্রাপ্ত এলাকায় অস্থায়ী শরণস্থল স্থাপন এবং ভবিষ্যতে পুরনো কাঠামোর নিরাপত্তা মূল্যায়ন করার পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। মন্ত্রিপরিষদে আলোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে, আন্তর্জাতিক তহবিলের মাধ্যমে পুনর্নির্মাণ কাজ ত্বরান্বিত করা এবং ভবন নির্মাণে কঠোর মানদণ্ড প্রয়োগ করা হবে।
অঞ্চলীয় বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, ত্রিপোলির মতো শহরে অবকাঠামো দুর্বলতা যদি সমাধান না করা হয়, তবে তা সামাজিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক ক্ষতির শৃঙ্খল সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে, বন্দর শহর হওয়ায় এই ধরণের ঘটনা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক রুটে বাধা সৃষ্টি করতে পারে এবং লেবাননের রপ্তানি-আমদানি ব্যালান্সকে প্রভাবিত করতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, ত্রিপোলিতে ঘটিত এই দু’টি ভবন ধসে পড়া ঘটনা লেবাননের অবকাঠামোগত দুর্বলতার একটি তীব্র উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও নাগরিক সমাজের সমন্বিত প্রচেষ্টা ছাড়া পুনর্নির্মাণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হবে। ভবিষ্যতে এমন ধরনের দুর্যোগ রোধে কাঠামোগত সংস্কার, তহবিলের সঠিক ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অপরিহার্য বলে বিশেষজ্ঞরা একমত।



