কক্সবাজারের কুতুবদিয়া উপজেলায় ৯ ফেব্রুয়ারি সকালবেলায় মাছ শিকারের জন্য বেরোনো ১৫ জন জেলে একটি ফিশিং ট্রলারের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। দ্রুতগতিতে আসা এফবি হার্টি নামের ট্রলারটি এফবি নুরুন নাহার‑১ ট্রলারকে আঘাত করে, ফলে নুরুন নাহার‑১ ট্রলার তৎক্ষণাৎ ডুবে যায় এবং জেলেরা সাগরে ছিটকে পড়ে।
নাসির উদ্দিনের মালিকানাধীন নুরুন নাহার‑১ ট্রলারটি গত শুক্রবার কুতুবদিয়া উপজেলায় থেকে মাছ ধরতে বেরোনো দলটি ব্যবহার করছিল। ট্রলারটি ভাসমান জালের কাজের জন্য প্রস্তুত ছিল এবং জেলেরা জাল তোলার কাজ শেষ করার পর ফিরে আসার পথে ছিল। রোববার দুপুরের আগে জাল তোলার কাজ শেষ করে যখন জেলেরা ট্রলারের কাছাকাছি এসে দাঁড়াল, তখন হার্টি ট্রলারটি উচ্চ গতিতে তাদের দিকে এগিয়ে এসে তীব্র ধাক্কা দিল।
ধাক্কা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নুরুন নাহার‑১ ট্রলারটি পানির নিচে ডুবে যায় এবং জেলেরা সাগরের ঢেউয়ে ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত কয়েকজন জেলে তৎক্ষণাৎ পানিতে ডুবে যাওয়ার শক থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করলেও, তীব্র আঘাতের ফলে ৫৫ বছর বয়সী আক্তার আলম বাদশা (উত্তর ধুরুং নয়াকাটা গ্রাম) ঘটনাস্থলেই মারা যান। অন্যজন জিয়াবুল মোহাম্মদ হোসেন তৎক্ষণাৎ পানিতে অদৃশ্য হয়ে যান এবং এখনো পাওয়া যায়নি।
বাকি ১৩ জন জেলেকে নিকটবর্তী অন্যান্য ট্রলারের সহায়তায় তাড়াতাড়ি উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকৃত জেলেরা সাগরের তীরবর্তী এলাকায় পৌঁছে, সেখানে উপস্থিত স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকরা প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করেন। পরে সব রোগীকে কুতুবদিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্থানান্তর করা হয়, যেখানে তাদের অবস্থা স্থিতিশীল রাখা হচ্ছে।
কুতুবদিয়া থানার ওসি মো. মাহবুবুল হক ঘটনাটির সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, ট্রলার ধাক্কার ফলে নুরুন নাহার‑১ ট্রলার ডুবে এক জেলে প্রাণ হারিয়েছেন এবং আরেকজন জেলেকে এখনও অনুসন্ধান করা হচ্ছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, মৃত জেলের দেহ কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হবে এবং নিখোঁজ জেলেকে উদ্ধার করার জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
স্থানীয় পুলিশ দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে, ডুবে যাওয়া ট্রলারটি পুনরুদ্ধার করার জন্য ডাইভিং টিমকে নিযুক্ত করেছে। একই সঙ্গে, নিখোঁজ জেলেকে অনুসন্ধান করার জন্য নৌকা ও হেলিকপ্টারসহ সব ধরনের সরঞ্জাম ব্যবহার করা হবে। পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া প্রাথমিক প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত চলবে এবং সংশ্লিষ্ট সকলের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মৃত জেলের পরিবারকে দুঃখ প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে মৃতদেহের শেষিকরণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানানো হয়েছে। মৃতদেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বিশ্লেষণ ও দেহের ক্ষতিগ্রস্ত অংশের পরীক্ষা ময়নাতদন্তের মাধ্যমে করা হবে, যাতে মৃত্যুর সঠিক কারণ নির্ধারণ করা যায়।
আহত ও বেঁচে থাকা জেলেদের জন্য স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীরা অবিলম্বে রক্তচাপ, শ্বাস-প্রশ্বাস ও শারীরিক ক্ষতিগ্রস্ত অংশের পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের অবস্থা স্থিতিশীল থাকলেও, দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক ও মানসিক প্রভাবের জন্য পরবর্তী পর্যায়ে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া হবে।
এই ঘটনার পর কুতুবদিয়া উপজেলায় মাছ ধরা কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগ একত্রে নিরাপত্তা বিধি কঠোরভাবে মানা হবে এবং একই ধরনের দুর্ঘটনা রোধে ট্রলার চালকদের জন্য অতিরিক্ত প্রশিক্ষণ ও সতর্কতা নির্দেশনা জারি করা হবে।
অধিক তথ্য সংগ্রহের জন্য কুতুবদিয়া থানার তদন্ত দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন চালিয়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের সংঘর্ষ এড়াতে মৎস্য ট্রলারগুলোর চলাচল নিয়ন্ত্রণে নতুন নীতি প্রণয়ন করা হবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। বর্তমানে, নিখোঁজ জেলেকে খুঁজে বের করার কাজ অব্যাহত রয়েছে এবং তার অবস্থান নিশ্চিত হলে পরিবারকে জানানো হবে।
এই দুর্ঘটনা মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের জন্য এক বড় শক এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপ ও সমন্বিত অনুসন্ধান কার্যক্রমের মাধ্যমে নিখোঁজ জেলেকে দ্রুত উদ্ধার করা এবং মৃত জেলের পরিবারকে যথাযথ সহায়তা প্রদান করা প্রত্যাশা করা হচ্ছে।



