ভোটের দিন ভোটকেন্দ্রে মোবাইল ফোন বহনের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের নির্দেশনা প্রকাশের পর সাংবাদিক সম্প্রদায়ে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। নির্দেশিকায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ভোটকেন্দ্রে মোবাইল বহন করা যাবে না, তবে এতে সাংবাদিকদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে কিনা তা পরিষ্কার নয়। ফলে, মাঠে সরাসরি তথ্য সংগ্রহের জন্য মোবাইলের ওপর নির্ভরশীল সাংবাদিকরা কাজের কঠিনতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা স্ট্রিমকে জানিয়েছেন যে, নির্দেশিকায় মোবাইল বহনের অনুমোদিত শ্রেণিতে সাংবাদিকদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। মোবাইল ছাড়া মাঠে সরাসরি কভারেজ করা বর্তমানে প্রায় অসম্ভব বলে তারা যুক্তি দেন। এ ধরনের সীমাবদ্ধতা নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মূল উদ্দেশ্যকে ক্ষুণ্ন করতে পারে, এ কথাও তারা উল্লেখ করেছেন।
সাংবাদিক সংগঠন রিপোর্টার্স ফোরাম ফর ইলেকশন অ্যান্ড ডেমোক্রেসি (RFED) এর সভাপতি কাজী জেবেল বলেন, ভোটের দিন কোন ব্যক্তি মোবাইল নিয়ে ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারবেন এবং কোনজন পারবেন না, এ ধরনের সিদ্ধান্ত নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তিনি আরও যোগ করেন যে, সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে একটি সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি, এবং মোবাইলের অনুমতি না দিলে তথ্য সংগ্রহে বাধা সৃষ্টি হবে।
বিপরীতমত প্রকাশকারী হিসেবে জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সদস্য জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সৈয়দ আবদাল আহমেদ উল্লেখ করেন, নির্বাচন দিবসে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে এই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। তিনি স্বীকার করেন যে, এই নির্দেশনা সাংবাদিকদের কাজের পরিধি কিছুটা সংকুচিত করবে, তবে তিনি আশা প্রকাশ করেন যে নির্বাচন কমিশন ভবিষ্যতে এই বিধানকে পুনর্বিবেচনা করবে।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদের স্ট্রিমের সঙ্গে যোগাযোগের সময় বলা হয়, চিঠির ভাষা থেকে বোঝা যায় যে, সাংবাদিকরাও এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়তে পারেন এবং মোবাইল নিয়ে ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারবেন না। তবে, বিষয়টি স্পষ্ট না হওয়ায় সংশ্লিষ্ট বিভাগে জিজ্ঞাসা করে স্পষ্টীকরণ চাওয়া হচ্ছে। যদি স্পষ্ট হয় যে, সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে এই বিধান প্রযোজ্য নয়, তবে তা প্রকাশ করা হবে; অন্যথায়, বিষয়টি কমিশনের আলোচনায় আনতে হবে।
এই পরিস্থিতিতে সাংবাদিকদের উদ্বেগের মূল কারণ হল, ভোটের সময় রিয়েল-টাইম তথ্য সংগ্রহের জন্য মোবাইল ফোন অপরিহার্য। মোবাইল ছাড়া ছবি তোলা, ভিডিও রেকর্ড করা এবং দ্রুত সংবাদ প্রেরণ করা কঠিন হয়ে পড়বে, যা ভোটের স্বচ্ছতা ও জনসাধারণের তথ্য অধিকারকে প্রভাবিত করতে পারে। সাংবাদিক সংগঠনগুলো এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সমন্বয় চায়, যাতে একটি সমন্বিত ও কার্যকর সমাধান বের করা যায়।
অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ভোটকেন্দ্রে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কিছু সীমাবদ্ধতা প্রয়োজন হতে পারে। তবে, এই সীমাবদ্ধতা কীভাবে সাংবাদিকদের কাজকে প্রভাবিত করবে, তা নিয়ে স্পষ্ট নীতি নির্ধারণের অভাব রয়েছে। কমিশনের প্রতিনিধিরা বলছেন যে, বিষয়টি নিয়ে অভ্যন্তরীণভাবে আলোচনা চালিয়ে যাবে এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনী করা হবে।
এই বিতর্কের রাজনৈতিক প্রভাবও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ভোটের স্বচ্ছতা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি জনসাধারণের আস্থা বজায় রাখতে মিডিয়ার স্বাধীনতা গুরুত্বপূর্ণ। যদি মোবাইল নিষেধাজ্ঞা দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী হয়, তবে এটি নির্বাচন প্রক্রিয়ার প্রতি সন্দেহ বাড়াতে পারে এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে উত্তেজনা বাড়াতে পারে। বিশেষ করে, বিরোধী দলগুলো এই সিদ্ধান্তকে নির্বাচন প্রক্রিয়ার হস্তক্ষেপ হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, ভোটকেন্দ্রে মোবাইল বহনের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে সাংবাদিকদের প্রতিবাদ ও কমিশনের ব্যাখ্যা দু’পক্ষেরই যুক্তি তুলে ধরেছে। এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রকাশিত হয়নি, তবে উভয় পক্ষই বিষয়টি দ্রুত সমাধান করে ভোটের স্বচ্ছতা ও তথ্য প্রবাহ নিশ্চিত করার আহ্বান জানাচ্ছে। ভবিষ্যতে এই বিষয়টি কীভাবে সমাধান হবে, তা নির্বাচন প্রক্রিয়ার সুষ্ঠু পরিচালনা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সূচক হবে।



