বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) বর্তমানে দেশীয় ফার্নেস অয়েল ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী সংস্থাগুলোর কাছ থেকে প্রায় ১৪,০০০ কোটি টাকার বকেয়া পরিশোধের দাবি মোকাবিলা করছে। এই বকেয়া পরিমাণের অধিকাংশই আট থেকে দশ মাসের বেশি সময় ধরে অমীমাংসিত রয়ে গেছে, যা বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর আর্থিক স্বাস্থ্যের ওপর গুরুতর চাপ সৃষ্টি করেছে।
বিপিডিবি-কে বকেয়া পরিশোধের তীব্রতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশের পর, দেশের প্রধান বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মালিকদের সমন্বয়কারী বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশন (বিপিপিএ) রাজধানীর একটি হোটেলে সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করে। সম্মেলনে সংগঠনের সভাপতি ডেভিড হাসনাত, প্রাক্তন সভাপতি ইমরান করিম, পরিচালক নাভিদুল হক ও ফয়সাল আহমেদ চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।
সম্মেলনের সময় ইমরান করিম উল্লেখ করেন, বকেয়া বিলের ফলে বৈদেশিক মুদ্রার হারের ওঠানামা এবং ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের চাপ মিলিয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো প্রায় ৮,০০০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। এই ক্ষতি মূলত বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি আমদানি এবং দৈনন্দিন পরিচালন ব্যয় মেটাতে উচ্চ সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হওয়ার ফলে ঘটেছে।
বকেয়া পরিশোধের দীর্ঘমেয়াদী দেরি সংস্থাগুলোর নগদ প্রবাহকে সংকুচিত করেছে, ফলে তারা প্রায়ই ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নিয়ে জ্বালানি ক্রয় ও কর্মী ব্যয় চালিয়ে যাচ্ছে। উচ্চ সুদের হার ও মুদ্রা মূল্যের অস্থিরতা তাদের আর্থিক সক্ষমতাকে আরও দুর্বল করে তুলছে, যা ভবিষ্যতে বিনিয়োগের পরিবেশকে অনিশ্চিত করে তুলতে পারে।
বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির ধারা ১৩.২(জ) অনুযায়ী, যদি বিপিডিবি নির্ধারিত সময়ে বিল পরিশোধে ব্যর্থ হয়, তবে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো সরবরাহ স্থগিত করার আইনি অধিকার রাখে এবং বিপিডিবি-র বিদ্যুৎ গ্রহণের অধিকারও সাময়িকভাবে স্থগিত হতে পারে। তবে জাতীয় স্বার্থের কথা বিবেচনা করে, এখন পর্যন্ত কোনো কেন্দ্র সম্পূর্ণভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করেনি।
বকেয়া থাকা সত্ত্বেও, সংস্থাগুলো ব্যাংক ঋণ ব্যবহার করে গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ চালিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি বিদ্যুৎ বাজারে সরবরাহের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সহায়তা করলেও, আর্থিক দিক থেকে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতি বাড়ার ঝুঁকি রয়ে গেছে।
বিপিডিবি-র বকেয়া পরিশোধে দেরি উৎপাদন সীমিত করতে বাধ্য করেছে, ফলে লোড বণ্টন কেন্দ্রের মাধ্যমে বাস্তব চাহিদার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ চাহিদা দেখিয়ে জরিমানা বাড়ানো হয়েছে। সংস্থাগুলো দাবি করে যে, অপর্যাপ্ত সরবরাহের ভিত্তিতে নির্ধারিত জরিমানা তাদের আর্থিক অবস্থা আরও খারাপ করে তুলছে।
বাজারের দৃষ্টিকোণ থেকে, এই আর্থিক সংকট বিদ্যুৎ খাতে ঋণগ্রহীতার ক্রেডিট রেটিংকে প্রভাবিত করতে পারে। ব্যাংকগুলো যদি ঝুঁকি বাড়ার অনুভূতি পায়, তবে ঋণের সুদ হার বৃদ্ধি পেতে পারে, যা বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচে সরাসরি প্রভাব ফেলবে। শেষ পর্যন্ত, এই খরচের বৃদ্ধি গ্রাহকদের বিদ্যুৎ বিলের মাধ্যমে শেয়ার হতে পারে।
বিপিডিবি-র বকেয়া পরিশোধের সময়সীমা রমজান মাসের আগেই ৬০ শতাংশ পরিশোধের আহ্বান করা হয়েছে। যদি এই লক্ষ্য অর্জিত না হয়, তবে চুক্তিগত অধিকার অনুসারে সরবরাহের অংশিক বা সম্পূর্ণ বন্ধের সম্ভাবনা উত্থাপিত হতে পারে, যা জাতীয় গ্রিডের স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করবে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, দীর্ঘমেয়াদে বকেয়া পরিশোধ না হলে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর বিনিয়োগ আকর্ষণ কমে যাবে এবং নতুন প্রকল্পের জন্য তহবিল সংগ্রহ কঠিন হবে। এছাড়া, বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বাড়লে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের তুলনায় ফার্নেস অয়েল ভিত্তিক কেন্দ্রের প্রতিযোগিতা হ্রাস পেতে পারে।
সারসংক্ষেপে, বিপিডিবি-র বকেয়া পরিশোধের দেরি দেশীয় বিদ্যুৎ উৎপাদন সংস্থাগুলোর আর্থিক স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে এবং ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ সরবরাহের ধারাবাহিকতা, টারিফের পরিবর্তন এবং বিনিয়োগের পরিবেশে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। দ্রুত এবং সমন্বিত সমাধান না হলে এই সংকটের পরিণতি বিদ্যুৎ বাজারের সামগ্রিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।



