ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবে সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে নাগরিক অধিকার সংস্থা “সুজন”ের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতিগুলোকে প্রশংসা করার সঙ্গে সঙ্গে বাস্তবায়নের স্পষ্ট পরিকল্পনার অভাবের দিকে ইঙ্গিত করেন। তিনি উল্লেখ করেন, ইশতেহারে যতই চমৎকার ও আকর্ষণীয় লক্ষ্য থাকুক না কেন, সেগুলো কাগজে রূপ নেয়ার পর বাস্তবে রূপান্তর না হলে তার কোনো মূল্য থাকে না।
মজুমদার বলেন, নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং নাগরিক হিসেবে সুজন এই প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতা পর্যবেক্ষণ করবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো তাদের অঙ্গীকারের বাস্তবায়ন না হলে নাগরিকরা আদালতে আবেদন করে বাধ্যতামূলক পদক্ষেপের দাবি করতে পারে, কারণ এই অঙ্গীকারগুলো লিখিত চুক্তির মতোই বাধ্যতামূলক।
সম্পাদক উল্লেখ করেন, দলগুলো মূলত জনগণ যা শুনতে চায়, সেসব বিষয়ই ইশতেহারে তুলে ধরেছে, তবে কোন প্রতিশ্রুতি কখন বাস্তবায়িত হবে, তহবিলের উৎস কী হবে, সংকটের সময় কোন বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে—এইসব মৌলিক প্রশ্নের উত্তর ইশতেহারে স্পষ্টভাবে দেওয়া হয়নি। তিনি ইশতেহারকে “লিস্ট অব থিংস” হিসেবে বর্ণনা করেন, যেখানে লক্ষ্যগুলো তালিকাভুক্ত আছে, কিন্তু সেগুলো অর্জনের জন্য নির্দিষ্ট রোডম্যাপ অনুপস্থিত।
একটি প্রশ্নের উত্তরে মজুমদার বলেন, কোনো ইশতেহারকে সম্পূর্ণ ভালো বা খারাপ বলা বাস্তবসম্মত নয়। তিনি বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় বিশ কোটি হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জন্য খাদ্য নিরাপত্তা, বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা রাষ্ট্রের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
মজুমদার আরও বলেন, যদিও বিভিন্ন দল কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য হ্রাস, বৈষম্য কমানো ইত্যাদি বড় লক্ষ্য ঘোষণা করেছে, তবে সেসব লক্ষ্য অর্জনের জন্য বাস্তবিক পরিকল্পনা ও তহবিলের উৎস স্পষ্ট নয়। এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা, পাঁচ বছরে বিশ কোটি গাছ রোপণ করা বা দেশের অর্থনীতিকে ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার মতো উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্যগুলো আকর্ষণীয় শোনালেও, বাস্তবায়নের ধাপ ও আর্থিক কাঠামো অনির্ধারিত রয়ে গেছে।
অতীতের উদাহরণ হিসেবে তিনি নারী প্রতিনিধিত্বের অঙ্গীকারের কথা তুলে ধরেন। সব বড় দলই কমপক্ষে পাঁচ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তবে বাস্তবে তা সম্পূর্ণভাবে পালন করা যায়নি। এই ধরনের অঙ্গীকার ভঙ্গের রেকর্ড রাজনৈতিক ইতিহাসে বিদ্যমান, যা ইশতেহারের বিশ্বাসযোগ্যতা হ্রাস করে।
ড. বদিউল আলম মজুমদার উল্লেখ করেন, জুলাই ২০২৫ সালের জাতীয় সনদের সঙ্গে কিছু দলের ইশতেহারে স্পষ্ট অসঙ্গতি দেখা যায়। যদিও সনদে দলগুলোর অবস্থান স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে, তবুও ইশতেহারে প্রস্তাবিত কিছু নীতি ও লক্ষ্য সনদের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এই পার্থক্য ভোটারদের জন্য বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে এবং নির্বাচনের পর নীতি বাস্তবায়নে জটিলতা বাড়াতে পারে।
সম্পাদক জোর দিয়ে বলেন, নাগরিকদের জন্য ইশতেহারকে শুধুমাত্র আকর্ষণীয় তালিকা হিসেবে নয়, বাস্তবায়নযোগ্য নীতি প্যাকেজ হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি। তিনি আহ্বান জানান, ভোটাররা ইশতেহারের প্রতিটি পয়েন্টের জন্য স্পষ্ট সময়সীমা, তহবিলের উৎস এবং দায়িত্বশীল সংস্থার নাম চেয়ে দেখতে হবে।
মজুমদার শেষ করেন, সুজনের দৃষ্টিতে নির্বাচনী ইশতেহারকে নাগরিক পর্যবেক্ষণের অধীনে রাখা এবং প্রয়োজনে আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে বাধ্যতামূলক করা গণতন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের অঙ্গীকারের সঙ্গে বাস্তবায়নের রূপরেখা যুক্ত করে ভোটারদের আস্থা পুনরুদ্ধার করবে এবং দেশের উন্নয়নকে টেকসই পথে এগিয়ে নেবে।



