কক্সবাজারের সমুদ্রতীরের ছায়া ছাড়িয়ে, হরিণাপাড়া বন রিজার্ভেশন এলাকা এবং রাখাইন পাড়া চৌফলান্দি অঞ্চলে অবস্থিত দুটি স্থানীয় গন্তব্যের সন্ধান করা হয়েছে। এই দুই স্থানের প্রকৃতি ও সংস্কৃতি শহরের প্রচলিত পর্যটক চিত্রকে সম্পূর্ণভাবে বদলে দেয়, যা স্থানীয় জীবনের প্রকৃত রঙ প্রকাশ করে। পর্যটন শিল্পের একঘেয়েমি ভাঙতে এবং কক্সবাজারের বহুমাত্রিক পরিচয় তুলে ধরতে এই অনুসন্ধান গুরুত্বপূর্ণ।
কক্সবাজারের নাম শোনার সঙ্গে সঙ্গে অধিকাংশের মনের মধ্যে সমুদ্রের বিশাল বালুকাময় তীর, সোনালী সূর্যাস্তের সময়ের ঝলক, এবং সমুদ্রের দিকে মুখ করে থাকা হোটেল বালকনির ছবি গড়ে ওঠে। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত হিসেবে পরিচিত এই শহরটি প্রায়ই একই রকম ফটো ও ভিডিওতে উপস্থাপিত হয়, যেখানে পর্যটকরা সমুদ্রের বিস্তৃত দিগন্তে মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করেন। এই প্রচলিত দৃশ্যপটের বাইরে শহরের অন্য দিকগুলো প্রায়শই উপেক্ষিত থাকে।
এইবারের ভ্রমণ কোনো বিদ্রোহের ফল নয়, বরং দীর্ঘ সময় ধরে একই রকম কাহিনী লিখে ও পড়ে ক্লান্তি থেকে উদ্ভূত। সমুদ্রের ছায়া ছাড়িয়ে শহরের প্রকৃত স্বভাব জানার ইচ্ছা নিয়ে লেখক হরিণাপাড়া বন রিজার্ভেশন এলাকায় গমন করেন। এই স্থানটি পর্যটন মানচিত্রে প্রায় অদৃশ্য, তবে শহরের কেন্দ্র থেকে মাত্র পনেরো মিনিটের দূরত্বে অবস্থিত, যা এটিকে সহজলভ্য হলেও অপ্রচলিত করে তোলে।
হরিণাপাড়া বন কোনো টিকিট কাউন্টার, স্মারক বিক্রেতা বা স্বাগতসূচক সাইনবোর্ড দিয়ে স্বাগত জানায় না; এখানে শুধু সবুজের বিশাল পর্দা বিস্তৃত। রাস্তা নিজেই কোনো ঘোষণামূলক চিহ্ন ছাড়াই প্রবেশযোগ্য, ফলে ভ্রমণকারীকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে হয়। সংক্ষিপ্ত পথচলার পর উপরে উঠে দেখা যায় ঢেউখেলানো সবুজ পাহাড়ের শৃঙ্গ, যা দূর পর্যন্ত মসৃণভাবে বিস্তৃত।
উচ্চতা থেকে দেখা দৃশ্যের প্রশস্ততা এবং তাজা বাতাসের স্পর্শে শহরের গর্জন যেন দূরে সরে যায়। শ্বাসের সঙ্গে সঙ্গে শ্বাসে তাজা হাওয়া প্রবেশ করে, যা দীর্ঘ সময়ের শহুরে ধোঁয়াটে বাতাসের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন অনুভূতি দেয়। এই মুহূর্তে কক্সবাজার কেবল একটি গন্তব্য নয়, বরং মানুষের বাস্তবিক বাসস্থান হিসেবে প্রকাশ পায়। সমুদ্রের তীরের ব্যস্ততা থেকে দূরে, এখানে প্রকৃতির নীরবতা এবং স্থানীয় জীবনের স্বাভাবিকতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
চৌফলান্দি এলাকার রাখাইন পাড়া, যা রাখাইন সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী বসতি, হরিণাপাড়া বনের পাশে অবস্থিত, আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উন্মোচন করে। এই পাড়া বহু বছর ধরে রাখাইন জনগণের বাসস্থান, যেখানে ঐতিহ্যবাহী কাঠের বাড়ি, সরু গলি এবং স্থানীয় বাজারের দৃশ্য দেখা যায়। বাসিন্দারা প্রধানত মাছ ধরা, চা বাগান এবং ছোটখাটো কৃষিকাজে যুক্ত, যা তাদের জীবনের স্বতন্ত্র রঙ যোগ করে।
রাখাইন পাড়ার রাস্তায় হেঁটে গেলে স্থানীয় ভাষা, সঙ্গীত এবং খাবারের গন্ধ মিশে থাকে। ইলিশের তাজা গন্ধ, মশলাদার মাছের ভাজা এবং গরম চা পানীয়ের স্বাদ ভ্রমণকারীর ইন্দ্রিয়কে মুগ্ধ করে। স্থানীয় মানুষদের আন্তরিক স্বাগত এবং তাদের দৈনন্দিন কাজকর্মের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে পর্যটকরা শহরের গভীর সংস্কৃতির এক ঝলক পায়।
এই দুই গন্তব্যের সমন্বয় কক্সবাজারের বহুমাত্রিক প্রকৃতিকে প্রকাশ করে, যেখানে সমুদ্রের বিশালতা এবং সবুজের শান্তি একসঙ্গে বিদ্যমান। পর্যটন শিল্পের জন্য এই ধরনের স্থানীয় অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এগুলো শুধুমাত্র নতুন দৃষ্টিকোণই নয়, বরং স্থানীয় অর্থনীতির বিকাশে সহায়তা করে। হরিণাপাড়া বনের পরিবেশ সংরক্ষণ এবং রাখাইন পাড়ার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা করা ভবিষ্যতে টেকসই পর্যটনের ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে।
পাঠকদের জন্য মূল বার্তা হল, কক্সবাজারের সমুদ্রতীরের পাশাপাশি তার অজানা সবুজ ও সাংস্কৃতিক গন্তব্যগুলো অন্বেষণ করা উচিত। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে সরাসরি মিথস্ক্রিয়া, তাদের খাবার ও জীবনধারা অভিজ্ঞতা করা, শুধু ভ্রমণকে সমৃদ্ধ করে না, বরং স্থানীয় সম্প্রদায়ের উন্নয়নে অবদান রাখে। তাই পরবর্তী সফরে কেবল সমুদ্রের ঢেউ নয়, হরিণাপাড়া বনের শীতল ছায়া এবং রাখাইন পাড়ার রঙিন সংস্কৃতিও আপনার তালিকায় যুক্ত করুন।



