একটি সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, বায়ু দূষণের মাত্রা বেশি থাকা দেশগুলোতে ডেঙ্গু রোগে মৃত্যুর হার বিশ্ব গড়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। গবেষণাটি ২৯ জানুয়ারি পরিবেশ বিজ্ঞানী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে এবং এতে বাংলাদেশসহ কয়েকটি উচ্চ দূষণযুক্ত দেশের তথ্য অন্তর্ভুক্ত। গবেষণার নেতৃত্বে ছিলেন বাংলাদেশি বিজ্ঞানী শাকিরুল খান, যিনি জাপানের ওইতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল অ্যান্ড লোকাল ইনফেকশাস ডিজিজ সেন্টারের ফুল ফ্যাকাল্টি সদস্য। বাংলাদেশ ও জাপানের মোট বারোজন বিজ্ঞানী এই গবেষণায় অংশগ্রহণ করেন।
গবেষণায় বায়ুতে উপস্থিত ক্ষুদ্র কণিকা, বিশেষ করে পিএম ২.৫ এবং অন্যান্য দূষণকারী উপাদানগুলোর সঙ্গে ডেঙ্গু রোগীর জটিলতা ও মৃত্যুর ঝুঁকির মধ্যে শক্তিশালী পরিসংখ্যানগত সম্পর্ক চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশ্লেষণে দেখা যায়, উচ্চ মাত্রার পিএম ২.৫ শ্বাসযন্ত্রের রক্তনালিতে প্রদাহ বাড়িয়ে রোগীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস করে, ফলে ডেঙ্গু ভাইরাসের আক্রমণ আরও মারাত্মক রূপ নিতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, ঘনবসতিপূর্ণ এবং বায়ু দূষণে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য এই ফলাফল বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধুমাত্র স্বাস্থ্যসেবা নয়, পরিবেশ সুরক্ষা এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণকেও সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এ ধরনের সমন্বিত নীতি গৃহীত হলে রোগের বিস্তার ও মৃত্যুহার কমাতে সহায়তা করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী ডেঙ্গু রোগে গড় মৃত্যুহার ০.২০ শতাংশ ছিল। একই সময়ে গ্লোবাল গড় পিএম ২.৫ মাত্রা ২৭.৩ মাইক্রোগ্রাম প্রতি ঘনমিটারে রেকর্ড করা হয়েছে। পিএম ২.৫ মাত্রা ৩৫ মাইক্রোগ্রাম ও তার উপরে থাকা দেশগুলো—যেমন বাংলাদেশ, বুরকিনা ফাসো এবং ইন্দোনেশিয়া—এখানে ডেঙ্গু মৃত্যুহার পিএম ২.৫ মাত্রা ১৫ মাইক্রোগ্রামের নিচে থাকা দেশের তুলনায় তিন থেকে পাঁচ গুণ বেশি।
একজন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের মতে, এই গবেষণা প্রথমবারের মতো বায়ু দূষণ ও ডেঙ্গু মৃত্যুহারের সরাসরি পরিসংখ্যানগত সংযোগ প্রমাণ করেছে। প্রচলিত ধারণার বিপরীতে, এখন স্পষ্ট যে পরিবেশগত উপাদানগুলো রোগের তীব্রতা ও ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে, স্বাস্থ্য নীতি গঠনকালে পরিবেশগত মানদণ্ড, দূষণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থা একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
গবেষণার ফলাফল নীতি নির্ধারকদের জন্য নতুন দৃষ্টিকোণ উন্মোচন করেছে। বায়ু মান উন্নয়নের জন্য কঠোর নিয়মাবলী, শহুরে পরিকল্পনা এবং শিল্প নির্গমন হ্রাসের পদক্ষেপগুলো ডেঙ্গু রোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে, স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি, রোগের দ্রুত সনাক্তকরণ এবং রোগীর পর্যবেক্ষণ শক্তিশালী করা জরুরি।
বাংলাদেশের মতো উচ্চ জনসংখ্যা ঘনত্ব এবং বায়ু দূষণের সম্মুখীন দেশগুলোর জন্য এই গবেষণা একটি সতর্কতা স্বরূপ। দূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ডেঙ্গু রোগের প্রভাব বাড়তে পারে, যা জনস্বাস্থ্যের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে। তাই, সরকার, পরিবেশ সংস্থা এবং স্বাস্থ্য বিভাগকে সমন্বিতভাবে কাজ করে দূষণ হ্রাস এবং রোগ প্রতিরোধের জন্য সমন্বিত কৌশল তৈরি করা উচিত।
অবশেষে, গবেষণার ফলাফল থেকে স্পষ্ট যে বায়ু মানের উন্নতি সরাসরি ডেঙ্গু রোগের মৃত্যুহার কমাতে পারে। এই তথ্যের ভিত্তিতে, নাগরিকদের জন্যও বায়ু দূষণ কমানোর ব্যক্তিগত পদক্ষেপ—যেমন গাছ রোপণ, গাড়ি ব্যবহার কমানো এবং পরিষ্কার জ্বালানি ব্যবহার—গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতে আরও গবেষণা এবং নীতি সমন্বয়ের মাধ্যমে বায়ু দূষণ ও ডেঙ্গু রোগের সংযোগকে সম্পূর্ণভাবে মোকাবেলা করা সম্ভব হবে।
ডেঙ্গু রোগের ঝুঁকি হ্রাসে পরিবেশগত মানদণ্ডের উন্নতি কতটা কার্যকর হবে, তা পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। আপনার এলাকায় বায়ু মানের পরিবর্তন এবং ডেঙ্গু রোগের প্রবণতা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়িয়ে, সঠিক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব কি?



