১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি চলাকালীন, বিএনপি ও জামাতের জোটের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলকে নতুন মোড়ে নিয়ে এসেছে। ভোটের তারিখ নির্ধারিত, এবং ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ এখন নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না, ফলে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর জন্য সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
পূর্বে বিরোধী দলগুলো ভোটের সময় মাঠে অনুপস্থিত থাকত বা তাদের শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার ও নির্বাসনের ফলে কার্যকরী ভূমিকা নিতে পারত না। তবে এবার পরিস্থিতি উল্টো, কারণ শীর্ষ নেতৃত্বের উপস্থিতি ও প্রচারমূলক কার্যক্রমের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, বিএনপি ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯২টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। দলটির প্রধানেরূপে কাজ করা তারেক রহমান উল্লেখ করেছেন, সরকার গঠন করতে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে দলটি আত্মবিশ্বাসী। এই আত্মবিশ্বাসের পেছনে দীর্ঘমেয়াদী সংগঠনমূলক প্রস্তুতি ও নির্বাচনী কৌশল কাজ করছে।
ইসলামিক দল জামাতও শক্তিশালী চ্যালেঞ্জ উপস্থাপন করছে। নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক দল এনসিপি (নতুন প্রজন্মের জেডের পার্টি) জামাতের সঙ্গে জোট গঠন করেছে, যা ধর্মীয় ভিত্তি ছাড়াও সংগঠনগত ধারাবাহিকতা প্রদর্শন করে ভোটারদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
দেশব্যাপী রাস্তায় ও ছোটখাটো দোকানে বিএনপির ধানের শীষ ও জামাতের দাঁড়িপাল্লার পোস্টার দেখা যাচ্ছে। পার্টির অফিসগুলোতে নির্বাচনী গান বাজছে, যা পূর্বের নির্বাচনের সময়ে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক সর্বত্র দেখা যেত তার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে।
বিশেষজ্ঞরা ব্যাখ্যা করছেন, জামাতের জনপ্রিয়তা ধর্মীয় কারণ নয়, বরং তাদের স্বচ্ছ ও ধারাবাহিক রাজনৈতিক চিত্র ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছে। সমীক্ষা অনুযায়ী, অধিকাংশ ভোটার দুর্নীতি, অর্থনৈতিক অবস্থা ও মুদ্রাস্ফীতি ইত্যাদি বিষয়কে ধর্মীয় বা প্রতীকী বিষয়ের তুলনায় বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
যুব ভোটারদের মধ্যে নতুন সরকারের কাছ থেকে ভোট ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার প্রত্যাশা বাড়ছে। প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন ২১ বছর বয়সী মোহাম্মদ রাকিব বলেন, “আগের সময়ে ভোট দেওয়া বা মত প্রকাশ করা কঠিন ছিল; আশা করি নতুন সরকার এই স্বাধীনতা বজায় রাখবে।” তার মতামত তরুণ প্রজন্মের বৃহত্তর অনুভূতিকে প্রতিফলিত করে।
আন্তর্জাতিক দৃষ্টিকোণ থেকে নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। শেখ হাসিনার প্রস্থানের ফলে ভারতের প্রভাব কমে গেছে, আর চীনের উপস্থিতি বাড়ছে বলে বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন। ফলে ভবিষ্যতে সরকার গঠন প্রক্রিয়ায় বিদেশি শক্তির ভূমিকা পুনর্গঠন হতে পারে।
বিএনপি ভারতের সঙ্গে আপেক্ষিকভাবে নমনীয় নীতি গ্রহণের সম্ভাবনা রাখলেও, জামাত-নেতৃত্বাধীন সরকার পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকতে পারে বলে কিছু বিশ্লেষক সতর্কতা প্রকাশ করেছেন। তবে জামায়াতে ইসলামী স্পষ্ট করে বলেছে, তারা কোনো দেশের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট নয় এবং নীতি নির্ধারণে স্বতন্ত্র থাকবে।
অর্থনৈতিক দিক থেকে বাংলাদেশ উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, দুর্বল বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ এবং বিনিয়োগের হ্রাসের মুখোমুখি। এই পরিস্থিতি ভোটারদের জন্য আর্থিক স্থিতিশীলতা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সার্বিকভাবে, ২০২৪ সালের এই নির্বাচন দেশের প্রথম বাস্তবিক প্রতিযোগিতামূলক ভোট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ভোটারদের প্রত্যাশা, দলীয় জোটের গঠন এবং আন্তর্জাতিক শক্তির পরিবর্তন সবই ফলাফলে প্রভাব ফেলবে। ফলস্বরূপ, নির্বাচনের পরবর্তী রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা দেশের অভ্যন্তরীণ নীতি ও বৈদেশিক সম্পর্কের ওপর গভীর প্রভাব ফেলবে।
ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নির্ধারিত হবে ভোটের ফলাফলের ওপর, যেখানে বিএনপি-জামাত জোটের পারফরম্যান্স, যুব ভোটারদের অংশগ্রহণ এবং অর্থনৈতিক নীতির বাস্তবায়নই মূল চালিকাশক্তি হবে। এই প্রক্রিয়া দেশের গণতান্ত্রিক উন্নয়নের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।



