নির্বাচন কমিশন ৮ ফেব্রুয়ারি রবিবার একটি নির্দেশনা জারি করে, যেখানে ভোটের দিন ভোটকেন্দ্রের চারশ গজের মধ্যে কোনো ভোটার মোবাইল ফোন নিয়ে প্রবেশ করতে পারবেন না বলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এই পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য ভোটের সময় ফোনের অপব্যবহার ও অনিয়ম রোধ করা, তবে এটি দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠী ও নাগরিক সমাজের মধ্যে তীব্র বিরোধের সৃষ্টি করেছে।
নির্দেশনাটি নির্বাচন ব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়‑১ শাখার সিনিয়র সহকারী সচিব মো. শহিদুল ইসলাম স্বাক্ষরিত, এবং দেশের সব ভোটকেন্দ্রেই সমানভাবে প্রয়োগের পরিকল্পনা করা হয়েছে। কমিশন এই নীতিকে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার একটি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপন করেছে, যদিও বিশদভাবে কোন প্রযুক্তিগত বা আইনি ভিত্তি উল্লেখ করা হয়নি।
নির্দেশনা প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই রাজনৈতিক নেতারা ও সিভিল সোসাইটি গোষ্ঠী থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। তারা যুক্তি দেন যে, মোবাইল ফোন ছাড়া ভোটারদের জরুরি পরিস্থিতিতে সহায়তা পাওয়া কঠিন হবে এবং তা তাদের মৌলিক নিরাপত্তা অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করবে।
হাসনাত আব্দুল্লাহ, যিনি ফেসবুকে সক্রিয়ভাবে রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে মন্তব্য করেন, তিনি উল্লেখ করেন যে এই নিষেধাজ্ঞা ভোটারদের ফোন বাড়িতে রেখে আসতে বাধ্য করবে, ফলে জরুরি কলের সুযোগ বন্ধ হয়ে যাবে। তিনি আরও বলেন, সিসি ক্যামেরা থাকলেও তা তৎক্ষণিক অনিয়ম রোধে মোবাইলের মতো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে না।
আব্দুল্লাহ এই সিদ্ধান্তকে নাগরিক সাংবাদিকতা সীমাবদ্ধ করার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখেন এবং এটিকে নির্বাচনী কারচুপির পূর্বলক্ষণ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি উল্লেখ করেন, জরুরি অবস্থায় কলের মাধ্যমে সাহায্য চাওয়ার সুযোগ বন্ধ করা অযৌক্তিক এবং এটি ভোটারদের ভোটকেন্দ্রের দিকে যাওয়ার ইচ্ছা কমিয়ে দিতে পারে।
ডাকসুরের ভাইস প্রেসিডেন্ট সাদিক কায়েমও একই সুরে তার ফেসবুক পোস্টে প্রশ্ন তোলেন, কোন ইশারায় বা প্রভাবে নির্বাচন কমিশন এই তথ্য অধিকার হরণকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তিনি বলেন, বিএনসির প্রত্যাহারের পর মোবাইল নিষেধের মাধ্যমে নাগরিকদের তথ্য প্রমাণ রাখার সুযোগ কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।
কায়েমের মতে, এই পদক্ষেপ দেশের তরুণ সমাজের নাগরিক অধিকারকে আঘাত করে এবং নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব একটি অবাধ ও সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করা, কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করা নয়। তিনি এই সিদ্ধান্তকে দেশের যুবকদের তথ্য সংগ্রহের স্বাধীনতা ও স্বচ্ছতার ওপর আঘাত হিসেবে উল্লেখ করেন।
প্রতিবাদে তরুণ ভোটার ও বিরোধী জোটগুলো একত্রিত হয়ে ভোটকেন্দ্রের নিকটে মোবাইল নিষেধকে স্বচ্ছ নির্বাচনের পথে প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তারা দাবি করে যে, এই নিষেধাজ্ঞা ভোটারদের স্বতন্ত্রভাবে তথ্য সংগ্রহ ও প্রমাণ সংরক্ষণে বাধা সৃষ্টি করবে, ফলে অনিয়মের প্রকাশ কঠিন হবে।
বিপক্ষের নেতারা হুঁশিয়ারি দেন যে, যদি এই নির্দেশনা বাতিল না করা হয়, তবে নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা চরম সংকটে পৌঁছাতে পারে। তারা উল্লেখ করেন, ভোটারদের নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করা হলে নির্বাচনের ফলাফলকে প্রশ্নের মুখে ফেলা যাবে।
আইনি বিশ্লেষকরা নির্দেশনার সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং উল্লেখ করেছেন যে, ভোটারদের মৌলিক যোগাযোগের অধিকার সীমাবদ্ধ করা সম্ভবত সংবিধানের ধারা লঙ্ঘন করতে পারে। কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, এই নিষেধাজ্ঞা আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে এবং তা বাতিলের সম্ভাবনা রয়েছে।
অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে, মোবাইল ফোনের মাধ্যমে গুজব ও সমন্বিত অনিয়মের ঝুঁকি বাড়তে পারে, তাই এই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। তারা জোর দিয়ে বলেছেন যে, ভোটের দিন নিরাপদ ও নির্ভুল প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার জন্য সকল প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
বিতর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, ভোটের আগে কমিশনকে এই নীতি পুনর্বিবেচনা করার আহ্বান বাড়ছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নাগরিক গোষ্ঠী একত্রে দাবি করছে যে, ভোটারদের জরুরি যোগাযোগের অধিকার সংরক্ষণ করে একই সঙ্গে অনিয়ম রোধের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা গৃহীত হওয়া উচিত।
এই বিষয়টি দেশের নির্বাচনী পরিবেশের গতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে, এবং ভোটের দিন পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞার ভবিষ্যৎ কী হবে তা নিয়ে আলোচনা অব্যাহত থাকবে।



