সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল‑১‑এ র্যাব ও ডিজিএফআইকে বিলুপ্ত করার দাবি জানিয়ে সাক্ষ্য প্রদান করেন। তিনি মানবতাবিরোধী গুম‑খুনের অভিযোগের প্রেক্ষিতে উভয় সংস্থার কার্যক্রমকে অবৈধ বলে উল্লেখ করেন। সাক্ষ্য শোনার স্থান ঢাকা, এবং পরবর্তী শুনানি ১৮ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত হয়েছে।
ট্রাইব্যুনাল‑১‑এর দুই সদস্যের বেঞ্চে বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদার প্রধান বিচারক হিসেবে আছেন, অন্য সদস্য হিসেবে বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ অংশগ্রহণ করছেন। উভয় বিচারক মানবাধিকার লঙ্ঘনের মামলায় পূর্বে বহু গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছেন।
ইকবাল করিম ভূঁইয়া র্যাবের অবিলম্বে বিলুপ্তি দাবি করে বলেন, যদি তা সম্ভব না হয় তবে র্যাবে নিযুক্ত সেনা সদস্যদের পুনরায় সামরিক বাহিনীতে ফিরিয়ে আনা উচিত। তিনি র্যাবের গঠন ও কার্যক্রমকে গুম‑খুনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করে দেখেছেন।
ডিজিএফআই সম্পর্কেও একই রকম দাবি তুলে ধরেন তিনি, যুক্তি দেন যে সংস্থাটি হত্যার সংস্কৃতি গড়ে তোলার পর থেকে বৈধতা হারিয়ে ফেলেছে এবং তাই তা বিলুপ্ত করা প্রয়োজন। তার মতে, নিরাপত্তা সংস্থার এই ধরনের কাজ দেশের নিরাপত্তা কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
ভূঁইয়া ২৫ জুন ২০১২ থেকে ২৫ জুন ২০১৫ পর্যন্ত সেনাপ্রধান পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন, যা পূর্বে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কালে ঘটেছিল। তার মেয়াদে বেশ কয়েকটি নিরাপত্তা সংক্রান্ত সংস্কার চালু হয়, তবে র্যাব ও ডিজিএফআই নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত থাকে।
সাক্ষ্য গ্রহণ রবিবার থেকে শুরু হয়ে সোমবার শেষ হয়; প্রথমে আংশিক জেরা দেওয়া হয় এবং পরবর্তী রায়ের জন্য ১৮ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত হয়েছে। আদালতে তার বক্তব্যের ভিত্তিতে র্যাব ও ডিজিএফআইয়ের কার্যক্রমের পুনর্মূল্যায়ন প্রত্যাশিত।
পূর্ববর্তী সাক্ষ্যে তিনি উল্লেখ করেন, সেনা প্রশিক্ষণের সময় সৈন্যদের ‘ডিহিউম্যানাইজ’ করা হয় যাতে তারা মানবিক বাধা ছাড়াই লক্ষ্যবস্তুকে ‘টার্গেট’ হিসেবে দেখেন। ফায়ারিং রেঞ্জে মানব আকৃতির টার্গেটের উপর গুলি করে এই মানসিক বাধা দূর করার পদ্ধতি প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
র্যাবের সৃষ্টি ২০০৩ সালে, যা ২০০২‑২০০৩ সালের ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’ পরবর্তী সময়ে গৃহীত হয়। তিনি বলেন, র্যাবের গঠন সেই সময়ের প্রশিক্ষণ পদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং ফলে গঠনকালীন কিছু অপরাধের দায়িত্ব র্যাবের ওপর পড়ে।
‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’ ১৬ অক্টোবর ২০০২ থেকে ৯ জানুয়ারি ২০০৩ পর্যন্ত বিএনপি‑জামাত জোট সরকার অধীনে চালু হয়। এই যৌথ অভিযান দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল করার লক্ষ্যে গৃহীত হয়েছিল, তবে পরে এর কার্যক্রম নিয়ে বিতর্ক উত্থাপিত হয়।
অভিযানের জন্য ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০০৩-এ ‘যৌথ অভিযান দায়মুক্তি আইন, ২০০৩’ প্রণয়ন করা হয়, যা অভিযানের সময় সংঘটিত অপরাধগুলোকে আইনি সুরক্ষা প্রদান করেছিল। তবে এক দশকের পর হাই কোর্ট এই আইনকে সংবিধানের সঙ্গে সাংবিধানিক বিরোধপূর্ণ ও অবৈধ বলে রায় দেয়, ফলে ঐ সময়ের দায়মুক্তি বাতিল হয়।
ইকবাল করিম ভূঁইয়ার এই দাবিগুলো দেশের নিরাপত্তা নীতি ও মানবাধিকার সংক্রান্ত আলোচনায় নতুন দিক যোগ করেছে। র্যাব ও ডিজিএফআইয়ের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সরকারী ও বিরোধী দল উভয়েরই স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে, নতুবা জনমত ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকের চাপ বাড়তে পারে।
সামনের দিনগুলোতে ট্রাইব্যুনালের রায় এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর ওপর সম্ভাব্য আইনি পদক্ষেপ দেশের নিরাপত্তা কাঠামোর পুনর্গঠনকে প্রভাবিত করতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক দলগুলো, বিশেষ করে আওয়ামী লীগ ও জামাত, তাদের নিরাপত্তা নীতি পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য হতে পারে।



