বাংলাদেশ ব্যাংক আজ তার জানুয়ারি‑জুন ২০২৬ মুদ্রানীতি ঘোষণার অংশ হিসেবে দেশের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির দৃষ্টিভঙ্গি হুমকির মুখে রয়েছে বলে সতর্কতা জানিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক উল্লেখ করেছে যে রাজনৈতিক অস্থিরতা, শিল্প উৎপাদনের ধীরগতি, স্থায়ী মুদ্রাস্ফীতি এবং বৈশ্বিক অস্থিরতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা কমিয়ে দিতে পারে।
বাজারে সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যকলাপ স্থিতিশীল থাকলেও, উপরে উল্লেখিত ঝুঁকিগুলি ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি হ্রাসের কারণ হতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থনীতিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে অবস্থান করিয়েছে, যেখানে সম্ভাব্য মন্দা থেকে বেরিয়ে স্থিতিশীলতা ও পুনরুজ্জীবনের ভিত্তি গড়ে তোলার প্রক্রিয়া চলছে।
কিন্তু মাইক্রো‑ম্যাক্রো আর্থিক চ্যালেঞ্জ, বিশেষত ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, স্বল্পমেয়াদে অর্থনৈতিক কার্যকারিতা হ্রাসের সম্ভাবনা তৈরি করছে। ব্যাংকিং সেক্টরের অবনতি, রেকর্ড উচ্চ স্তরের সমস্যাযুক্ত সম্পদ এবং তহবিলের অপর্যাপ্ত মূলধন এই উদ্বেগের মূল কারণ।
বাংলাদেশ ব্যাংক উল্লেখ করেছে যে, সমস্যাযুক্ত সম্পদের পরিমাণ সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে এবং মূলধন ঘাটতি ব্যাংকগুলোকে অতিরিক্ত তহবিলের উৎস থেকে ঘাটতিপূর্ণ সেক্টরে সম্পদ স্থানান্তরে বাধা দিচ্ছে। ফলে, সঞ্চয়ী ইউনিট থেকে ঋণপ্রাপ্ত ইউনিটে তহবিলের প্রবাহে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে, যা অর্থনীতির সামগ্রিক তরলতা কমিয়ে দিতে পারে।
মুদ্রাস্ফীতি সাম্প্রতিককালে ধীরগতি পেয়েছে, তবে হ্রাসের গতি প্রত্যাশিত চেয়ে ধীর। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে যে, মুদ্রাস্ফীতি প্রত্যাশা এখনও লক্ষ্যমান স্তরে দৃঢ়ভাবে স্থাপিত নয়, যা মূল্য স্থিতিশীলতা রক্ষার প্রচেষ্টাকে জটিল করে তুলতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে, জানুয়ারি‑জুন ২০২৬ মেয়াদে নীতি সুদের হার ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। সুদের হার স্থিতিশীল রাখার মাধ্যমে, ব্যাংকটি মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে আর্থিক বাজারের স্বাভাবিকতা বজায় রাখতে চায়।
বহিরাগত দিক থেকে, দেশের মুদ্রা হার স্থিতিশীল, রেমিট্যান্স প্রবাহ শক্তিশালী এবং সুদের পার্থক্য অনুকূল হওয়ায় অর্থনৈতিক অবস্থান উন্নত হয়েছে। এই উপাদানগুলো সামগ্রিক বহিরাগত ভারসাম্যকে সমর্থন করে এবং বিনিয়োগকারীর আস্থা বাড়ায়।
বিশেষ করে, এই বছর বিদেশে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পেয়েছে, যা রেমিট্যান্সের প্রবাহকে ত্বরান্বিত করেছে এবং স্বল্পমেয়াদে বহিরাগত অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে। রেমিট্যান্সের ধারাবাহিক প্রবাহ অর্থনীতির মুদ্রা সরবরাহ বাড়িয়ে ভোক্তা ব্যয়কে সমর্থন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে আমদানি বৃদ্ধির প্রবণতা বহিরাগত ভারসাম্যের ওপর চাপ বাড়াতে পারে। আমদানি বাড়ার ফলে বাণিজ্য ঘাটতি বাড়তে পারে, যা মুদ্রা রিজার্ভের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
রপ্তানি ক্ষেত্রে, উৎপাদনশীলতার ফাঁক দ্বিতীয়ার্ধে রপ্তানি পারফরম্যান্সকে আরও দুর্বল করতে পারে। রপ্তানি বৃদ্ধির জন্য কাঠামোগত সংস্কার এবং উৎপাদন দক্ষতা বাড়ানো জরুরি, নতুবা পুনরুদ্ধার ধীরগতি পাবে।
বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তা এবং ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা রপ্তানি ও মূলধন প্রবাহে অতিরিক্ত প্রভাব ফেলতে পারে। এই আন্তর্জাতিক ঝুঁকিগুলি দেশের বাণিজ্যিক পরিবেশকে আরও জটিল করে তুলবে, ফলে নীতি নির্ধারকদের সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন।
সারসংক্ষেপে, বাংলাদেশ ব্যাংক রাজনৈতিক ঝুঁকি, ব্যাংকিং খাতের চাপ, মুদ্রাস্ফীতি গতিবিধি এবং বহিরাগত ভারসাম্যের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবকে গুরুত্ব দিয়ে সতর্কতা প্রকাশ করেছে। নীতি সুদের হার অপরিবর্তিত রেখে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ভবিষ্যৎ ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এই সতর্কতা ও নীতি দিকনির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।



