বাংলাদেশ ব্যাংক আজ জানিয়েছে যে বর্তমান আর্থিক বছরের জানুয়ারি‑জুন সময়ের জন্য আর্থিক নীতি প্রকাশ করা হয়েছে। মূল সুদের হার, অর্থাৎ রেপো রেট, ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে, যদিও মুদ্রাস্ফীতি লক্ষ্যমানের উপরে স্থায়ীভাবে রয়েছে। এই সিদ্ধান্তের পেছনে মূলত ক্রেডিট চাহিদা নিয়ন্ত্রণ এবং মুদ্রা প্রবাহের ভারসাম্য রক্ষা করা।
ইনফ্লেশন জানুয়ারিতে তৃতীয় মাস ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে ৮.৫৮ শতাংশে পৌঁছেছে, যা রমজানের পূর্বে খাদ্যদ্রব্যের দামের উত্থানের ফলে হয়েছে। ১২ মাসের গড় মুদ্রাস্ফীতি ৮.৬৬ শতাংশে রয়ে গেছে, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের ৭ শতাংশের নিচে নামানোর লক্ষ্যের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
মূল হার স্থিতিশীল রাখার পাশাপাশি, বাংলাদেশ ব্যাংক ইন্টারব্যাংক বাজারের অপ্রয়োজনীয় জটিলতা দূর করতে স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (SDF) হার ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে দিয়েছে। এই সমন্বয়টি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে অতিরিক্ত তরলতা কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা রাখার পরিবর্তে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রদান বাড়াতে উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে।
বিকেন্দ্রীকৃত ঋণ প্রবাহের মাধ্যমে উৎপাদন খাত ও ভোক্তা ব্যয়ের বৃদ্ধি প্রত্যাশা করা হচ্ছে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক গতি ত্বরান্বিত করতে পারে। তবে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক উল্লেখ করেছে যে মুদ্রাস্ফীতির চাপ এখনও “উচ্চ এবং অসম” অবস্থায় রয়েছে, ফলে হঠাৎ মূল হার কমানো ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
বিনিময় হার স্থিতিশীলতা বজায় রাখা আমদানি মূল্যের ওপর প্রভাব কমাতে গুরুত্বপূর্ণ বলে বাংলাদেশ ব্যাংক জোর দিয়েছে। মুদ্রাস্ফীতি ধীরগতি না পেলে টাকার মানের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে, যা অর্থনৈতিক নীতির সামগ্রিক ভারসাম্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
দ্রুত পরিবর্তনশীল কিছু ঝুঁকি উপাদানও নীতি বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। আসন্ন জাতীয় নির্বাচন, রমজান মাসের ভোক্তা চাহিদা বৃদ্ধি, এবং নতুন জাতীয় বেতন কাঠামোর সম্ভাব্য বাস্তবায়ন—all এই বিষয়গুলো সাধারণত চাহিদা বাড়িয়ে মুদ্রাস্ফীতিতে ত্বরান্বিত করে। তাই, এই উপাদানগুলোকে বিবেচনা করে নীতি সমন্বয় করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে যে, যদিও সাম্প্রতিক মাসে মূল্যবৃদ্ধি ধীর হতে শুরু করেছে, তবু তা সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণে আনতে অতিরিক্ত সময় লাগবে। তাই, মূল সুদের হার হ্রাসের আগে মুদ্রাস্ফীতির গতি আরও কমে যাওয়া দরকার।
ডিপোজিট হার হ্রাসের ফলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো অতিরিক্ত তহবিলকে ঋণ হিসেবে ব্যবহার করতে উৎসাহিত হবে, যা উৎপাদন, রপ্তানি ও অবকাঠামো প্রকল্পে তহবিল প্রবাহ বাড়াতে সহায়তা করবে। এই পদক্ষেপটি অর্থনীতির গতি পুনরুজ্জীবিত করার একটি কৌশল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অন্যদিকে, ডিপোজিট হার কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর লাভের মার্জিনে সাময়িক চাপ আসতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে ঋণ পোর্টফোলিও বাড়ার ফলে মোট আয় বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাজার বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেছেন যে, এই নীতি পরিবর্তনটি আর্থিক সেক্টরের তরলতা ব্যবস্থাপনা ও ঋণ সরবরাহের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম সমন্বয়। তদুপরি, মুদ্রা বাজারে টাকার মানের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে রপ্তানি ও আমদানি খাতে মূল্য পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
সামগ্রিকভাবে, বাংলাদেশ ব্যাংকের এই পদক্ষেপগুলো মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার দ্বৈত লক্ষ্যকে প্রতিফলিত করে। নীতি ধারাবাহিকতা ও সতর্কতা বজায় রেখে ভবিষ্যৎ আর্থিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
অবশেষে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক উল্লেখ করেছে যে, মুদ্রাস্ফীতি হ্রাসের গতি যদি প্রত্যাশিত স্তরে না পৌঁছায়, তবে মূল সুদের হার পুনরায় সমন্বয় করা হতে পারে। তাই, বাজার অংশগ্রহণকারীদের জন্য নীতি পরিবর্তনের সম্ভাবনা সম্পর্কে সতর্ক থাকা জরুরি।



