রমজান এক সপ্তাহেরও কম সময়ে শুরু হতে চলেছে। এই পবিত্র মাসে খাবারের চাহিদা স্বাভাবিকভাবে বাড়ে, তবে গৃহস্থালীর ওপর বাড়তি দামের চাপ বাড়ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী জানুয়ারিতে খাবারের মুদ্রাস্ফীতি ৮.২৯ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ডিসেম্বরের তুলনায় প্রায় অর্ধ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
খাবারের দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়ার ফলে সামগ্রিক মুদ্রাস্ফীতির মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। সেপ্টেম্বরের ৭.৬৪ শতাংশ থেকে অক্টোবরের ৭.০৮ শতাংশে হ্রাসের পর, পরবর্তী তিন মাসে খাবারের মুদ্রাস্ফীতি ধারাবাহিকভাবে বাড়ে। এই ধারাবাহিকতা সামগ্রিক মুদ্রাস্ফীতির প্রবণতাকে প্রভাবিত করেছে।
হেডলাইন মুদ্রাস্ফীতি অক্টোবরের ০.১৯ শতাংশ পয়েন্ট হ্রাসের পর আবার বাড়তে থাকে এবং জানুয়ারিতে ৮.৫৮ শতাংশে পৌঁছেছে। অন্যদিকে, অ-খাবার মুদ্রাস্ফীতি জানুয়ারিতে ৮.৮১ শতাংশে নেমে এসেছে, যা পোশাক, পরিবহন, বাসস্থান এবং অন্যান্য সেবার দামের চাপ কমে যাওয়া নির্দেশ করে।
বেতন বৃদ্ধির হার জানুয়ারিতে মাত্র ০.১ শতাংশ পয়েন্ট বাড়ে এবং ৮.০৮ শতাংশে স্থিত হয়। চার বছর ধরে বেতন বৃদ্ধির হার মুদ্রাস্ফীতির চেয়ে ধারাবাহিকভাবে কম থাকায় গৃহস্থালী ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলো খাবারের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্থবির আয়ের ফলে আর্থিক সংকটে পড়ছে।
অর্থনীতিবিদ ও নীতি বিশ্লেষকরা এই খাবারের দামের উত্থানকে দুইটি প্রধান কারণের ফলাফল হিসেবে দেখছেন: নির্বাচন সংক্রান্ত ব্যয় বৃদ্ধি এবং রমজানের পূর্বে মৌসুমী চাহিদা। বিশ্বব্যাংকের প্রাক্তন ঢাকা শাখার প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হুসেইন উল্লেখ করেন, জানুয়ারিতে চাহিদা ও সরবরাহ উভয় দিকেই অস্বাভাবিক চাপ দেখা গিয়েছে।
চাহিদা দিক থেকে নির্বাচন প্রস্তুতির জন্য ব্যক্তিগত ব্যয় শীর্ষে পৌঁছায়, যা খাবারের ক্ষেত্রে চাহিদা টেনে নিয়ে আসে। এই চাহিদা টান খাবারের দামের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। সরবরাহ দিক থেকে, তরল পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সংকট উল্লেখযোগ্য, কারণ গৃহস্থালী রান্নার জন্য এলপিজি ব্যাপকভাবে ব্যবহার করে। এলপিজি সরবরাহের ঘাটতি রান্নার খরচ বাড়িয়ে দেয়, ফলে খাবারের সামগ্রিক দামের ওপর চাপ বাড়ে।
এই সমন্বিত চাহিদা-সরবরাহ চাপ গৃহস্থালীর বাজেটকে তীব্রভাবে প্রভাবিত করছে। রমজানের আগের সময়ে খাবারের চাহিদা বাড়তে থাকায় দাম আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও অ-খাবার দামের হ্রাস কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে, তবু খাবারের দামের দ্রুত বৃদ্ধি গৃহস্থালীর সামগ্রিক ব্যয় কাঠামোকে নষ্ট করে দিচ্ছে।
বাজার বিশ্লেষকরা পূর্বাভাস দিচ্ছেন, রমজান চলাকালীন খাবারের চাহিদা উচ্চ থাকবে, ফলে দাম স্থিতিশীল না থেকে বাড়তে পারে। সরকার যদি সরবরাহ দিকের সমস্যাগুলো, বিশেষ করে এলপিজি সংকট, দ্রুত সমাধান না করে, তবে খাবারের মুদ্রাস্ফীতি ৯ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে।
অন্যদিকে, অ-খাবার পণ্যের দামের হ্রাস গৃহস্থালীর অন্যান্য ব্যয় বিভাগে সাময়িক স্বস্তি এনে দিতে পারে। তবে, বেতনের বৃদ্ধি মুদ্রাস্ফীতির তুলনায় ধীর হওয়ায় বাস্তব আয় ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। এই পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
খুচরা বিক্রেতারা জানিয়েছেন, চাল, গম, চিনি ইত্যাদি মৌলিক পণ্যের বিক্রয় বাড়লেও, মার্জিনও বাড়ছে। একই সঙ্গে, আমদানি নির্ভর কিছু পণ্যের দামের ওঠানামা গৃহস্থালীর জন্য অতিরিক্ত ঝুঁকি তৈরি করছে। সরকারী আর্থিক নীতি নির্বাচন সময়ে ব্যয় বাড়িয়ে রাখলে চাহিদা টান বজায় থাকবে, যা দামের ওপর ঊর্ধ্বমুখী চাপ বজায় রাখবে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, সরবরাহ দিকের হস্তক্ষেপ ছাড়া খাবারের মুদ্রাস্ফীতি রমজান শেষ হওয়ার পরেও উচ্চ মাত্রায় থাকতে পারে। সামগ্রিক অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি সতর্ক, কারণ মুদ্রাস্ফীতি ও বেতনের পার্থক্য গৃহস্থালীর আর্থিক স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে।
সংক্ষেপে, জানুয়ারিতে খাবারের মুদ্রাস্ফীতি ৮.২৯ শতাংশ, হেডলাইন মুদ্রাস্ফীতি ৮.৫৮ শতাংশ, অ-খাবার মুদ্রাস্ফীতি ৮.৮১ শতাংশ, এবং বেতন বৃদ্ধি ৮.০৮ শতাংশে স্থিত হয়েছে। নির্বাচন ব্যয় ও রমজান পূর্বের মৌসুমী চাহিদা এই দামের উত্থানের প্রধান চালিকাশক্তি। গৃহস্থালী, বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের গোষ্ঠী, এই সময়ে বাড়তি দামের সঙ্গে স্থবির আয়ের দ্বৈত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। সরকার ও নীতিনির্ধারকদের জন্য এখনই সরবরাহ দিকের সমস্যাগুলো সমাধান করা এবং দামের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে রমজানের পবিত্র মাসে খাবারের দাম অতিরিক্ত বাড়ে না।



