গত বছরগুলোতে মালিকদের দ্বারা তেলবাহী ও অন্যান্য বাণিজ্যিক জাহাজের পরিত্যাগের ঘটনা তীব্রভাবে বেড়ে গেছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য শ্রমিক ফেডারেশন (ITF) অনুসারে, ২০২৫ সালে ৪১০টি জাহাজ পরিত্যক্ত হয়েছে, যেখানে ২০১৬ সালে এই সংখ্যা মাত্র ২০টি ছিল। একই সময়ে ৬,২২৩ জন বাণিজ্যিক নাবিকের কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় প্রায় এক‑তৃতীয়াংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
এই প্রবণতার একটি স্পষ্ট উদাহরণ হল রাশিয়ার দূরপ্রাচ্যের একটি তেলবাহী জাহাজ, যা নভেম্বরের শুরুর দিকে চীনের দিকে রওনা হয়। জাহাজে প্রায় ৭৫০,০০০ ব্যারেল রাশিয়ান কাঁচা তেল লোড ছিল, যার আনুমানিক মূল্য ৫০ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ৩৭ মিলিয়ন পাউন্ড)। তবে, ডিকেম্বরে জাহাজটি আন্তর্জাতিক জলে পরিত্যক্ত অবস্থায় ধরা পড়ে, কারণ ক্রু মাসের পর মাস বেতন পাননি।
যাত্রাপথে ক্রুদের মৌলিক সরবরাহের ঘাটতি দেখা দেয়। মাংস, শস্য, মাছের মতো মৌলিক খাবারের অভাবের ফলে তাদের স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটেছে এবং কাজের পরিবেশে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ক্রুদের মধ্যে ক্ষুধা ও অসন্তোষের পরিবেশ গড়ে ওঠে, যা দৈনন্দিন বেঁচে থাকার সংগ্রামকে তীব্র করে তুলেছে।
ITF দ্রুত হস্তক্ষেপ করে এবং ক্রুদের ডিসেম্বর পর্যন্ত বেতন প্রদান নিশ্চিত করে। তদুপরি, সংস্থা জাহাজে খাবার, পানীয় জল এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী পাঠায়। কিছু নাবিককে তাদের দেশ ফেরত পাঠানো হয়েছে, তবে অধিকাংশ, যার মধ্যে ইভান নামের একজন সিনিয়র ডেক অফিসারও অন্তর্ভুক্ত, এখনও জাহাজে অবস্থান করছে।
চীনের কর্তৃপক্ষ জাহাজটিকে বন্দর প্রবেশের অনুমতি দিতে অনিচ্ছুক, যা আন্তর্জাতিক জলে জাহাজের অবস্থানকে দীর্ঘায়িত করে। এই পরিস্থিতি জাহাজের মালিক ও বীমা সংস্থার জন্য আর্থিক ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়, কারণ তেলবাহী জাহাজের দীর্ঘমেয়াদী পরিত্যাগের ফলে পণ্য ক্ষতি ও পরিবহন বিলম্বের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়।
পরিত্যাগের মূল কারণ হিসেবে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা উল্লেখ করা হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বব্যাপী সংঘাতের বৃদ্ধি, কোভিড-১৯ মহামারীর পরবর্তী সরবরাহ শৃঙ্খলের ব্যাঘাত এবং ফ্রেইট রেটের অস্থিরতা কিছু অপারেটরের আর্থিক স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ফলে, কিছু কোম্পানি দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকি থেকে বাঁচতে জাহাজ পরিত্যাগের দিকে ঝুঁকেছে।
শিপিং শিল্পে এই প্রবণতা বীমা প্রিমিয়াম ও ফ্রেইট চুক্তির শর্তে প্রভাব ফেলছে। বীমা সংস্থা পরিত্যক্ত জাহাজের ঝুঁকি মূল্যায়ন করে প্রিমিয়াম বাড়িয়ে দেয়, যা শিপিং কোম্পানির অপারেশনাল খরচে অতিরিক্ত বোঝা যোগায়। একই সঙ্গে, ফ্রেইট রেটের অস্থিরতা গ্রাহকদের জন্য সরবরাহের সময়সূচি অনিশ্চিত করে, ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সামগ্রিক দক্ষতা হ্রাস পায়।
বাজার বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে, পরিত্যক্ত জাহাজের সংখ্যা যদি এই গতিতে বৃদ্ধি পায়, তবে শিপিং সেক্টরে তহবিলের প্রবাহে উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়বে। তেলবাহী জাহাজের মতো উচ্চমূল্যের পণ্য বহনকারী জাহাজের পরিত্যাগ সরাসরি তেল বাজারের সরবরাহ চেইনে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে, যা তেলের দামের অস্থিরতা বাড়িয়ে তুলবে।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ও বাণিজ্যিক গোষ্ঠী পরিত্যাগের ঝুঁকি কমাতে নিয়মকানুনের কঠোরতা বাড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছে। ক্রুদের বেতন ও জীবনযাত্রার মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিক চুক্তি ও তত্ত্বাবধানের প্রয়োজনীয়তা জোরদার করা হচ্ছে।
ভবিষ্যতে শিপিং শিল্পকে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য আর্থিক সুরক্ষা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের স্থিতিশীলতা বাড়াতে হবে। তেলবাহী জাহাজের পরিত্যাগের প্রবণতা যদি অব্যাহত থাকে, তবে বীমা খাত, লজিস্টিকস সেবা এবং তেল বাজারে দীর্ঘমেয়াদী অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। তাই, শিল্পের অংশীদারদের জন্য প্রোঅ্যাকটিভ পদক্ষেপ গ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা শক্তিশালী করা জরুরি।



