১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০টি আসনের জন্য ভোটগ্রহণ হবে এবং একই দিনে গণভোটের মাধ্যমে ভোটারদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়েছে। দেশের সর্বোচ্চ আইনসভা গঠনের এই প্রক্রিয়া দেশের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের নিষেধাজ্ঞার ফলে ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ এবারের নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না, ফলে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিএনপি ও জামাতের জোটের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। উভয় দলই অধিকাংশ আসন জয় করে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের লক্ষ্যে প্রচারণা চালাচ্ছে।
সংসদে একক বা নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য মোট আসনের অর্ধেকের বেশি, অর্থাৎ অর্ধেক+১ আসন প্রয়োজন। ৩০০টি আসনের সংসদে এই সংখ্যা ১৫১। একই ধারণা যুক্তরাজ্যের হাউজ অব কমন্সে ৬৫০টি আসনের মধ্যে ৩২৬ এবং ভারতের লোকসভায় ৫৪৩টি আসনের মধ্যে ২৭২ আসন হলে প্রযোজ্য।
একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনকারী দল বা জোটের নেতা সাধারণত রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ পায়। তবে স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকলেও সর্বাধিক আসনপ্রাপ্ত দলকে সরকার গঠনের সুযোগ দেওয়া হতে পারে, শর্ত থাকে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার সমর্থন প্রমাণ করা।
১৯৯১ সালে বিএনপি এবং ১৯৯৬ সালের জুনে আওয়ামী লীগ সর্বোচ্চ আসন পেয়েও একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় অন্য দলের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করেছিল। ঐতিহাসিক উদাহরণগুলো বর্তমান নির্বাচনের পরিপ্রেক্ষিতে জোট গঠন বা সমঝোতা সরকারের সম্ভাবনা তুলে ধরে।
যদি কোনো দল বা জোট এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারে, তবে তা “ঝুলন্ত পার্লামেন্ট” নামে পরিচিত। এই অবস্থায় সরকার গঠনের জন্য দলগুলোর মধ্যে জোট বা সমঝোতা দরকার হয়।
যুক্তরাজ্যে ২০১০ ও ২০১৭ সালের নির্বাচনে ঝুলন্ত পার্লামেন্টের পরিস্থিতি দেখা গিয়েছিল। ২০১০ সালে কনজারভেটিভ পার্টি লিবারেল ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে জোট গঠন করে সরকার গঠন করে, আর ২০১৭ সালে থেরেসা মে উত্তর আয়ারল্যান্ডের ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়নিস্ট পার্টির সমর্থন নিয়ে শাসন চালায়।
ভারতে বিভিন্ন সময়ে ঝুলন্ত পার্লামেন্টের উদাহরণ দেখা গেছে, যেখানে একাধিক দলকে একত্রে কাজ করে সরকার গঠন করতে হয়। এসব অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশে প্রাসঙ্গিক, বিশেষ করে যখন প্রধান দুই দলই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হতে পারে।
সংসদ বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সাবেক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমেদ উল্লেখ করেন, একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য ১৫১টি আসন প্রয়োজন এবং এই সীমা অতিক্রম করলে সরকার গঠন সহজ হয়। তিনি আরও বলেন, ঝুলন্ত পার্লামেন্টের ক্ষেত্রে জোট গঠন প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ এবং রাজনৈতিক সমঝোতা প্রয়োজন।
নির্বাচনের পর ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপতি সরকার গঠনের জন্য আমন্ত্রণ জানাবেন এবং নতুন প্রধানমন্ত্রীকে শপথ গ্রহণের মাধ্যমে সরকার চালু হবে। এই প্রক্রিয়া সংবিধানিকভাবে নির্ধারিত এবং নির্বাচনের ফলাফলের ওপর নির্ভরশীল।
যদি কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পায়, তবে সর্বাধিক আসনপ্রাপ্ত দলকে সংসদে সমর্থন নিশ্চিত করতে অন্য দলের সঙ্গে জোট গঠন করতে হবে। জোট গঠনের শর্তাবলী, মন্ত্রিপরিষদের বণ্টন এবং নীতি সমন্বয় নিয়ে আলোচনা হবে, যা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার মূল চাবিকাঠি।
বিএনপি ও জামাতের জোটের ক্ষেত্রে, উভয় দলের নেতৃত্বের মধ্যে সমঝোতা এবং নীতি সমন্বয় কীভাবে হবে তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে উভয় পক্ষই জোটের মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের সম্ভাবনা বাড়াতে চাচ্ছে।
অবশিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলো, বিশেষ করে ছোট দল ও স্বাধীন প্রার্থীরা, তাদের সমর্থন দিয়ে জোট গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাদের সমর্থন ছাড়া কোনো জোটের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে।
পরবর্তী ধাপে, নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর সরকার গঠনের আলোচনার সময়সূচি নির্ধারিত হবে এবং সংসদীয় সেশন শুরু হবে। এই সময়ে আইনসভা কার্যক্রম পুনরায় চালু হবে এবং দেশের নীতি নির্ধারণে নতুন দিকনির্দেশনা গৃহীত হবে।
সংক্ষেপে, ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া নির্বাচন দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা, ঝুলন্ত পার্লামেন্ট এবং জোট গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলমান, এবং ফলাফল অনুযায়ী ক্ষমতা হস্তান্তর ও সরকার গঠনের প্রক্রিয়া সংবিধানিক নিয়ম অনুসারে সম্পন্ন হবে।



