চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) এক আদেশে নিউমুরিং টার্মিনাল (এনসিটি) ইজারা না দেওয়ার দাবিতে আন্দোলন করা পনেরো কর্মচারীর জন্য বরাদ্দ করা বাসা বাতিলের সিদ্ধান্ত জানায়। আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২ ফেব্রুয়ারি জনস্বার্থে এই কর্মীদের মোংলা ও পায়রা বন্দরগুলোতে বদলি করা হয় এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে অবমুক্ত করা হয়। অবমুক্তির দুই কার্যদিবসের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হলেও, কর্মীরা এখনও বদলি করা স্থানে উপস্থিত হননি, ফলে তাদের জন্য বরাদ্দ করা বাসা (যদি থাকে) বাতিল করা হবে বলে বিভাগীয় প্রধানদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বদলিপ্রাপ্ত পনেরো কর্মীর মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক মো. হুমায়ুন কবীর ও মো. ইব্রাহিম খোকন অন্তর্ভুক্ত। তালিকায় আরও মো. ফরিদুর রহমান, মোহাম্মদ শফি উদ্দিন, রাশিদুল ইসলাম, আবদুল্লাহ আল মামুন, মো. জহিরুল ইসলাম, খন্দকার মাসুদুজ্জামান, মো. হুমায়ুন কবীর (এসএস পেইন্টার), মো. শাকিল রায়হান, মানিক মিঝি, মো. শামসু মিয়া, মো. লিয়াকত আলী, আমিনুর রসুল বুলবুল এবং মো. রাব্বানী নাম উল্লেখ রয়েছে।
প্রতিবাদকারীরা এনসিটি ইজারা না দেওয়া, বন্দর চেয়ারম্যানের প্রত্যাহারসহ চারটি মূল দাবির ভিত্তিতে রোববার থেকে ধর্মঘট শুরু করে। এই দাবিগুলি বন্দর পরিচালনার স্বচ্ছতা, কর্মীর অধিকার সুরক্ষা এবং বাণিজ্যিক নীতির পুনর্বিবেচনা নিয়ে গঠিত। ধর্মঘটের আগে ৩১ জানুয়ারি থেকে তারা তিন দিন ধারাবাহিকভাবে প্রতিদিন আট ঘণ্টা কর্মবিরতি পালন করে, যা বন্দর কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য ব্যাঘাত সৃষ্টি করে।
৩১ জানুয়ারি থেকে ধারাবাহিক কর্মবিরতির পর, গত মঙ্গলবার থেকে আবারও অব্যাহত ধর্মঘট চালু হয়। তবে বৃহস্পতিবার নৌপরিবহন উপদেষ্টার সঙ্গে আন্দোলনকারীদের এক বৈঠকের পর, দুই দিনের জন্য এই অব্যাহত ধর্মঘট সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। বৈঠকে উভয় পক্ষের মতবিরোধ সমাধানের চেষ্টা করা হয় এবং কর্মীদের নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক স্বার্থের সমন্বয় সাধনের লক্ষ্যে আলোচনা হয়।
এই পদক্ষেপের ফলে বন্দর পরিচালনা সংস্থার কর্মী ব্যবস্থাপনা নীতি পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে। বাসা বরাদ্দ বাতিলের সিদ্ধান্ত কর্মীদের মনোবল হ্রাসের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলেছে, যা ভবিষ্যতে শ্রমিক বিরোধের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে, বদলি করা কর্মীদের নতুন স্থানে যোগদানের অনিচ্ছা বন্দর ব্যবস্থাপনার কর্মী পুনর্বিন্যাস প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে, শ্রমিক আন্দোলন ও বাসা বরাদ্দের পরিবর্তন বন্দর কার্যক্রমে অস্থায়ী ব্যাঘাত ঘটাতে পারে, যা রপ্তানি-আমদানি শিপমেন্টের সময়সূচিতে বিলম্বের সম্ভাবনা তৈরি করে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম বন্দর দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর হওয়ায়, কোনো ধরণের অপারেশনাল বাধা আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক অংশীদারদের আস্থা কমাতে পারে।
আবাসন বরাদ্দের রদবদল বন্দর কর্মীদের দীর্ঘমেয়াদী সুবিধা পরিকল্পনার ওপরও প্রভাব ফেলবে। যদি এই ধরনের সিদ্ধান্ত পুনরাবৃত্তি হয়, তবে ভবিষ্যতে কর্মী নিয়োগ ও ধরে রাখার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত খরচের সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে, কারণ নতুন কর্মী আকৃষ্ট করতে বাসা ও অন্যান্য সুবিধা পুনরায় নিশ্চিত করতে হবে।
বাজার বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, শ্রমিক বিরোধের সম্ভাব্য বৃদ্ধি বন্দর শুল্ক, লোডিং ও আনলোডিং সময় এবং সামগ্রিক লজিস্টিক খরচে প্রভাব ফেলতে পারে। যদিও বর্তমান পর্যন্ত কোনো সরাসরি আর্থিক ক্ষতি প্রকাশিত হয়নি, তবে দীর্ঘমেয়াদে এই ধরনের বিরোধ বন্দর পরিচালনার খরচ কাঠামোতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
সংক্ষেপে, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের বাসা বরাদ্দ বাতিলের সিদ্ধান্ত এবং কর্মী বদলির অনুপস্থিতি শ্রমিক-প্রশাসনিক সম্পর্কের নতুন চ্যালেঞ্জ উপস্থাপন করেছে। বন্দর পরিচালনা সংস্থার জন্য এখনই প্রয়োজনীয় হল কর্মী অধিকার রক্ষার পাশাপাশি অপারেশনাল ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা, যাতে বাণিজ্যিক প্রবাহে কোনো বাধা না আসে এবং ভবিষ্যতে অনুরূপ বিরোধের ঝুঁকি কমে।
এই পরিস্থিতি থেকে স্পষ্ট যে, শ্রমিকদের দাবি ও বন্দর ব্যবস্থাপনার নীতি সমন্বয় না হলে, বন্দর কার্যক্রমে পুনরাবৃত্তি বিরোধের সম্ভাবনা থাকে, যা দেশের সামগ্রিক বাণিজ্যিক পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই, উভয় পক্ষের মধ্যে গঠনমূলক সংলাপ এবং ন্যায্য নীতি প্রয়োগই দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার মূল চাবিকাঠি।



