নিউজিল্যান্ডের সাদা-সুপ্রিমেসি উগ্রবাদী ব্রেন্টন ট্যারান্ট, যিনি ২০১৯ সালের মার্চে ক্রাইস্টচার্চের দু’টি মসজিদে ৫১ জনের প্রাণহানি এবং আরও ৪০ জনের প্রাণহানির হুমকি দিয়েছিলেন, তার দোষ স্বীকারের আপিল এই সপ্তাহে আদালতে শোনা হবে। ট্যারান্ট ইতিমধ্যে কোনো প্যারোল ছাড়াই আজীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত, কারণ তিনি আত্মঘাতী আত্মহত্যা না করে অপরাধ স্বীকার করে শাস্তি গ্রহণ করেছেন।
প্রথমে অভিযোগ অস্বীকারের পর এক বছর পর ট্যারান্ট দোষ স্বীকার করেন এবং এক গণহত্যা ও সন্ত্রাসী কাজের অভিযোগে দোষ স্বীকারের মাধ্যমে শাস্তি পেয়েছেন। এখন তিনি সময়সীমা অতিক্রম করেও আপিল দাখিল করে দাবি করছেন যে, কারাগারের “যন্ত্রণা ও অমানবিক” পরিবেশে তিনি যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম ছিলেন না। এই আপিলের পাশাপাশি তিনি শাস্তি হ্রাসের জন্যও আবেদন করেছেন।
শুনানিটি নিউজিল্যান্ডের ওয়েলিংটন অবস্থিত কোর্ট অফ আপিলের হাউসে পুরো সপ্তাহ জুড়ে চলবে এবং ট্যারান্ট ভিডিও লিঙ্কের মাধ্যমে সাক্ষ্য দেবেন। আদালত এই শুনানির রেকর্ডিংকে দেরি করে সম্প্রচার করবে, যাতে শিকারের পরিবার ও সংশ্লিষ্ট জনগণ ঘটনাটির অগ্রগতি অনুসরণ করতে পারেন।
২০১৯ সালের মার্চ মাসে ক্রাইস্টচার্চের আল নূর মসজিদ ও লিনউড ইসলামিক সেন্টারে সংঘটিত হামলা, যা সরাসরি লাইভস্ট্রিমের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী দেখা গিয়েছিল, দেশের অস্ত্র নীতি কঠোর করার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সেই ঘটনার পর নিউজিল্যান্ড সরকার দ্রুত গুলির লাইসেন্স কঠোর করে এবং স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের মালিকানা সীমিত করে।
শিকারের পরিবারগুলোর মধ্যে আল-উমারি পরিবার বিশেষভাবে এই শুনানির দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন। হুসেইন আল-উমারি, যিনি আল নূর মসজিদে নিহত হয়েছিলেন, তার বোন আয়া আল-উমারি এই সপ্তাহে আদালতে ট্যারান্টের মুখোমুখি হওয়ার কথা জানিয়ে তার মানসিক কষ্টের পুনরাবৃত্তি সম্পর্কে সতর্কতা প্রকাশ করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, “আমি আদালতের রায়ের পর মনে করেছিলাম যে, এখন সব কষ্ট শেষ, আর আমি নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে মনোযোগ দেব, কিন্তু এই মামলাটি আবারও আমার মনে ফিরে আসছে।”
আয়া আল-উমারি জানান, তিনি ভিডিও লিঙ্কে ট্যারান্টের মুখ দেখবেন, তবে তিনি তাকে কোনোভাবে গুরুত্ব দেবেন না, কারণ “এখন তার কোনো প্রভাব আমার ওপর নেই।” তিনি ট্যারান্টের সম্ভাব্য উদ্দেশ্যকে “আবারো ট্রমা জাগিয়ে তোলা এবং নিজের আলোকে বাড়িয়ে তোলা” হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন এবং এ ধরনের প্রচেষ্টা তাকে বাধা দিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
হুসেইন আল-উমারির বীরত্বের স্বীকৃতিতে তাকে নিউজিল্যান্ডের ব্রেভারি স্টার পুরস্কার প্রদান করা হয়েছিল, যা ট্যারান্টের বিরুদ্ধে তার সাহসিকতা ও আত্মত্যাগকে স্বীকৃতি দেয়। শিকারের পরিবার এখন ট্যারান্টের পুনরায় মুক্তি বা শাস্তি হ্রাসের সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বিগ্ন, কারণ তা শিকারের মানসিক পুনরুদ্ধারের পথে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
এই শুনানির সময় আদালত ট্যারান্টের আপিলের বৈধতা, সময়সীমা অতিক্রমের কারণ এবং তার দাবির ভিত্তি বিশ্লেষণ করবে। আইনগত দৃষ্টিকোণ থেকে, দোষ স্বীকারের পর দণ্ডের পুনর্বিবেচনা করা কঠিন, তবে ট্যারান্টের “অমানবিক শর্তে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত নিতে অক্ষমতা” যুক্তি আদালতে কতটা গ্রহণযোগ্য হবে তা নির্ধারণ করা হবে।
অধিকন্তু, ট্যারান্টের শাস্তি হ্রাসের আবেদনও একই সময়ে বিবেচিত হবে। তার দোষ স্বীকারের পরেও, যদি আদালত তার শর্তাবলি ও মানসিক অবস্থা পুনরায় মূল্যায়ন করে, তবে শাস্তি হ্রাসের সম্ভাবনা থাকতে পারে। তবে শিকারের পরিবার ও মানবাধিকার সংস্থাগুলি এই ধরনের কোনো হ্রাসকে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যানের ইঙ্গিত দিয়েছে।
শুনানির ফলাফল দেশের নিরাপত্তা নীতি ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। যদি ট্যারান্টের আপিল প্রত্যাখ্যান করা হয়, তবে এটি দোষ স্বীকারের পর শাস্তি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কঠোর দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখবে। অন্যদিকে, যদি কোনো রকম হ্রাস অনুমোদিত হয়, তবে তা ভবিষ্যতে অনুরূপ অপরাধের শাস্তি নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে।
শিকারের পরিবার, বিশেষ করে আল-উমারি পরিবার, এই শুনানিকে তাদের কষ্টের পুনরাবৃত্তি না হওয়ার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে দেখছেন। তারা আদালতের রায়কে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের পুনরুদ্ধার ও শিকারের স্মৃতিকে সম্মান করার একটি সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করতে চায়।
শুনানির সময়সূচি ও ফলাফল সম্পর্কে আরও তথ্য প্রকাশিত হলে, তা জনসাধারণের কাছে জানানো হবে, যাতে সকল সংশ্লিষ্ট পক্ষের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষা পায়।



