অধিকাংশ বিচারিক সংস্কারকে কেন্দ্র করে ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে সর্বোচ্চ আদালতের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার ধারা প্রণীত হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার গেজেটে প্রকাশের মাধ্যমে এই বিধানকে কার্যকর করার প্রস্তুতি জানিয়েছে। তবে নতুন সচিবালয়ের স্বতন্ত্রতা নিশ্চিত হবে কিনা, তা পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীল।
অধ্যাদেশের ১ নং ধারার ২ উপধারায় বলা হয়েছে, সর্বোচ্চ আদালতের সচিবালয় সম্পূর্ণভাবে চালু হওয়া পর্যন্ত সরকার সর্বোচ্চ আদালতের সঙ্গে পরামর্শ করে ধারা‑৭ এর বিধান গেজেটের মাধ্যমে প্রজ্ঞাপন করবে। এই শর্ত পূরণ না হলে সচিবালয়ের কার্যক্রম স্থগিত থাকবে।
ধারা‑৭-এ সর্বোচ্চ আদালতের সচিবালয়কে পরিষেবার প্রশাসনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা হিসেবে নির্ধারিত করা হয়েছে। এছাড়া সংবিধানের ধারা‑১১৬ অনুসারে, পরিষেবা সদস্যদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাবিধান সংক্রান্ত কাজ রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক পদক্ষেপের মাধ্যমে সম্পন্ন হবে।
পরিষেবা সদস্যদের শৃঙ্খলাবিধান সংক্রান্ত বিষয়গুলো সর্বোচ্চ আদালতের রেজিস্ট্রার জেনারেলের মাধ্যমে সচিবের কাছে উপস্থাপিত হবে, এবং সংশ্লিষ্ট কমিটির পরামর্শে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এই কমিটির সদস্যদের নির্বাচন প্রক্রিয়া অনুযায়ী আপিল বিভাগের বিচারকগণ মনোনীত করবেন।
ধারা‑৭‑এর উপ‑ধারা (২) সত্ত্বেও, আইন ও বিচার বিভাগ এবং অন্যান্য সংস্থার অধীনে পরিষেবা সদস্যদের পদায়ন বা বদলি সংক্রান্ত কাজ রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ধারা‑১৩৩ অনুযায়ী, সর্বোচ্চ আদালতের সঙ্গে পরামর্শ করে সম্পন্ন করবেন। এই প্রক্রিয়ায় আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা পাওয়া যাবে।
অন্তর্র্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ ২০ নভেম্বর ২০২৫-এ সর্বোচ্চ আদালতের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা সংক্রান্ত অধ্যাদেশের খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে। একই দিন গেজেটের মাধ্যমে প্রকাশের পর, এই বিধানকে কার্যকর করার জন্য সরকারী স্বাক্ষর প্রয়োজনীয় বলে জানানো হয়।
সর্বোচ্চ আদালতের প্রধান বিচারপতি ২৭ অক্টোবর ২০২৪-এ আদালতের স্বতন্ত্র প্রশাসনিক কাঠামো গঠনের প্রস্তাব আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পাঠান। এই প্রস্তাবের ভিত্তিতে পরবর্তীতে অধ্যাদেশের খসড়া তৈরি হয় এবং অন্তর্র্বর্তী সরকারের অনুমোদন পায়।
বাংলাদেশ সরকার দাবি করে, সর্বোচ্চ আদালতের আলাদা সচিবালয় গঠন বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক স্বতন্ত্রতা নিশ্চিত করবে এবং বিচারিক স্বাধীনতা শক্তিশালী করবে। সরকার এই পদক্ষেপকে দেশের আইনি কাঠামোর আধুনিকীকরণ হিসেবে উপস্থাপন করেছে।
তবে বিরোধী দল ও কিছু আইনি বিশ্লেষক উল্লেখ করেন, গেজেট প্রকাশের পরেও নতুন সরকারকে এই অধ্যাদেশের অনুমোদন দিতে হবে, নতুবা সচিবালয়ের কার্যক্রম স্থগিত থাকবে। তাই বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সম্পূর্ণ নিশ্চিত হয়েছে কিনা, তা এখনো অনিশ্চিত।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেন, নির্বাচনের পর যদি নতুন সরকার এই অধ্যাদেশকে রদ না করে, তবে বিচারিক কাঠামোতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে এবং বিচারিক সিদ্ধান্তে স্বতন্ত্রতা বৃদ্ধি পাবে। অন্যদিকে, যদি অনুমোদন না হয়, তবে বর্তমান প্রশাসনিক ব্যবস্থা বজায় থাকবে এবং স্বতন্ত্রতা প্রশ্নবিদ্ধ থাকবে।
সর্বোচ্চ আদালতের আলাদা সচিবালয় গঠনের প্রক্রিয়া এখন পর্যন্ত গেজেট প্রকাশ এবং ভবিষ্যৎ সরকারের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এই পর্যায়ে সরকার ও বিচার বিভাগের পারস্পরিক সমন্বয়, পাশাপাশি রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি নির্ধারণ করবে যে, দেশের বিচারিক স্বাধীনতা কতদূর পর্যন্ত বাস্তবায়িত হবে।



