ঢাকা শহরে আজ অনুষ্ঠিত এক উচ্চ পর্যায়ের সম্মেলনে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রের আর্থিক সহায়তা বৃদ্ধি করার জরুরি প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকের পর এই বিষয়টি তুলে ধরেন, যেখানে দেশের দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন কৌশলকে শক্তিশালী করার কথা বলা হয়।
বৈঠকটি ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ তারিখে, যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের পার্শ্ববর্তী একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত হয়। দুই পক্ষের আলোচনায় আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতা, শিক্ষার্থী বিনিময় এবং প্রযুক্তি স্থানান্তরের সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা উল্লেখ করেন, বর্তমান সময়ে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে শিক্ষা ও গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানো অপরিহার্য।
বাংলাদেশ সরকার বর্তমানে মোট জিডিপির প্রায় ২.৫ শতাংশই শিক্ষা ও গবেষণায় ব্যয় করে আসছে, যা প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় কম। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা এই সংখ্যা বাড়িয়ে ৪ শতাংশের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য স্থির করেছেন, যাতে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আধুনিক ল্যাব ও গবেষণা সুবিধা পায়। তিনি উল্লেখ করেন, অতিরিক্ত তহবিলের মাধ্যমে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগে নতুন গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করা সম্ভব হবে।
বিনিয়োগের ঘাটতি প্রধানত অবকাঠামো, প্রশিক্ষিত মানবসম্পদ এবং আধুনিক সরঞ্জামের অভাবে প্রকাশ পায়। অনেক সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পুরোনো সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়, ফলে গবেষণার গুণগত মান কমে যায়। এছাড়া, শিক্ষক ও গবেষকদের জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম না থাকায় নতুন প্রযুক্তি গ্রহণে বাধা সৃষ্টি হয়।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা জোর দিয়ে বলেন, শিক্ষা ও বিজ্ঞান ক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়ালে সরাসরি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে রপ্তানি ভিত্তিক শিল্পের উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে। তিনি উল্লেখ করেন, দেশের বৈশ্বিক বিশ্ববিদ্যালয় র্যাঙ্কিংয়ে উন্নতি পেতে হলে গবেষণা প্রকাশনা এবং পেটেন্টের সংখ্যা বাড়াতে হবে।
বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যে জাতীয় শিক্ষা নীতি ২০২২-এ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। তবে বাস্তবায়নের জন্য পর্যাপ্ত বাজেট এবং কার্যকরী তদারকি প্রয়োজন। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা এই নীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে নতুন তহবিলের উৎস সনাক্ত করার আহ্বান জানান।
বহিরাগত আর্থিক সহায়তা এবং প্রযুক্তি স্থানান্তরের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও পার্টনার দেশের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তিগুলোকে পুনর্বিবেচনা করে গবেষণা প্রকল্পে সরাসরি তহবিল প্রবাহ নিশ্চিত করা যাবে।
অন্যান্য দেশের সফল উদাহরণে দেখা যায়, সিঙ্গাপুর এবং দক্ষিণ কোরিয়া শিক্ষায় ব্যাপক বিনিয়োগের মাধ্যমে উচ্চ প্রযুক্তি শিল্পে রূপান্তর ঘটিয়েছে। এই দেশগুলোতে সরকারী তহবিলের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা এই মডেলগুলোকে বাংলাদেশে প্রয়োগের সম্ভাবনা তুলে ধরেছেন।
বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়াতে কর সুবিধা, গবেষণা গ্রান্ট এবং স্টার্ট‑আপ ইকোসিস্টেমের উন্নয়ন প্রয়োজন। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা উল্লেখ করেন, নতুন উদ্ভাবনী কোম্পানিগুলোকে প্রাথমিক পর্যায়ে আর্থিক সহায়তা দিলে দেশের প্রযুক্তি ভিত্তিক শিল্প দ্রুত বিকশিত হবে।
নীতিগত সংস্কারও সমানভাবে জরুরি। গবেষণা তহবিলের স্বচ্ছতা, পেটেন্ট রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়ার সহজীকরণ এবং আন্তর্জাতিক মানের মূল্যায়ন পদ্ধতি গ্রহণের মাধ্যমে বিনিয়োগের আকর্ষণ বাড়ানো সম্ভব। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে ত্বরিত পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানান।
লক্ষ্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে পরবর্তী পাঁচ বছরে শিক্ষা ও গবেষণার বাজেটকে জিডিপির ৪ শতাংশে পৌঁছানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই সময়সীমার মধ্যে নতুন গবেষণা কেন্দ্র, আধুনিক ল্যাব এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে গবেষণা আউটপুট বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারিত।
পাঠকদের জন্য ব্যবহারিক টিপস হিসেবে বলা যায়, শিক্ষার্থী ও গবেষকরা আন্তর্জাতিক স্কলারশিপ ও ফান্ডিং প্রোগ্রাম অনুসরণ করে নিজের প্রকল্পে তহবিল সংগ্রহ করতে পারেন। এছাড়া, স্থানীয় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে গবেষণা ও উন্নয়ন প্রকল্পে অংশগ্রহণের জন্য উৎসাহিত করা উচিত।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা শেষ করে জিজ্ঞাসা করেন, “আপনারা কি দেশের ভবিষ্যৎ গঠনে শিক্ষা ও বিজ্ঞানকে অগ্রাধিকার দিতে প্রস্তুত?” এই প্রশ্নটি নাগরিকদের মধ্যে আলোচনার সূচনা করে, যাতে সমগ্র সমাজের সমন্বিত প্রচেষ্টা দিয়ে লক্ষ্য অর্জন করা যায়।



