শুক্রবার রাত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার সংলগ্ন সড়কে ‘হিম উৎসব’ অনুষ্ঠানের সময় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি আরিফুর রহমানের ওপর একদল ছাত্রের শারীরিক হামলা ঘটেছে। আরিফুর, যিনি সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের সম্মান স্নাতক তৃতীয় বর্ষের ছাত্র, ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন এবং সংবাদ সংগ্রহের কাজ করছিলেন। হঠাৎ করে কিছু ছাত্র তার মোবাইল ফোনটি জোরপূর্বক তুলে নেয় এবং তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে।
আক্রমণকারী দলের মধ্যে পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিক্স বিভাগের ৪৮ ব্যাচের মোহাম্মদ ইমন, দর্শন বিভাগের ৪৮ ব্যাচের মো. সাহানুর রহমান সানজু এবং অজানা পাঁচ-ছয়জন ছাত্র অন্তর্ভুক্ত ছিল। তারা আরিফুরের সাংবাদিক পরিচয় জানার পরই তাকে ঘিরে নেয় এবং ক্যামেরা ও মোবাইলের উপর দখল করার চেষ্টা করে। এই ঘটনার ফলে আরিফুরের শারীরিক ক্ষতি এবং মানসিক উদ্বেগ দেখা দেয়।
আক্রমণের পর আরিফুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর আব্দুর রাজ্জাক এবং জাবি সাংবাদিক সমিতির সভাপতি মেহেদী মামুনের কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দেন। তিনি জানান যে একই রাতের পরে বাংলা বিভাগের ৫১ ব্যাচের ইমন বাবু সহ আরও কিছু ছাত্র আবার ফিরে এসে তাকে দ্বিতীয়বার শারীরিকভাবে হেনস্তা করে। এই পুনরাবৃত্তি আক্রমণ তার নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
আক্রমণকারী দল সামাজিক মাধ্যমে ঘটনাটির ভুল তথ্য ছড়িয়ে দেয় বলে আরিফুর অভিযোগ করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে তাদের ফেসবুক পেজ থেকে অপপ্রচার চালিয়ে তার সুনাম ক্ষুন্ন করার চেষ্টা করা হয়েছে। এই ধরনের অনলাইন প্রচার ঘটনার প্রকৃত স্বভাবকে বিকৃত করতে পারে বলে তিনি সতর্কতা প্রকাশ করেছেন।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত আরেকজন সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের ছাত্র এবং কালের কণ্ঠের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি রিফাত বিন নূর ঘটনাটির দৃশ্য বর্ণনা করেন। রিফাতের মতে, দুইজন ছাত্রের মধ্যে তর্কের পর প্রায় দশ থেকে পনেরোজনের একটি দল আরিফুরকে ঘিরে তার ক্যামেরা ও মোবাইলের উপর নিয়ন্ত্রণ নিতে চেয়েছিল। তিনি এবং তার এক বন্ধু ঘটনাস্থলে এসে দেখেন যে সবাই হঠাৎ করে আরিফুরের সামগ্রী নিয়ে টানাটানি করছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর এ কে এম রাশিদুল আলম ঘটনাটির তদন্তের জন্য একটি কমিটি গঠন করার নির্দেশ দেন। তিনি উল্লেখ করেন যে কমিটি বিষয়টি বিশদভাবে পর্যালোচনা করবে এবং প্রমাণের ভিত্তিতে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবে। তদন্তের ফলাফল জানার পরই সংশ্লিষ্ট ছাত্রদের শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।
জাবি সাংবাদিক সমিতির সভাপতি মেহেদী মামুনও ঘটনাটির গুরুতরতা তুলে ধরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাদের কাজের স্বাধীনতা রক্ষা করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মৌলিক দায়িত্ব। মামুনের মতে, এ ধরনের হিংসা সাংবাদিকতার স্বচ্ছতা ও নৈতিকতার ওপর আঘাত হানে।
আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে, হিংসাত্মক আক্রমণ এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তি জব্দ করা উভয়ই অপরাধমূলক কাজ হিসেবে গণ্য হয়। বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং হিংসা রোধের জন্য যথাযথ শাস্তি প্রদান করা বাধ্যতামূলক। তাই তদন্ত কমিটি প্রমাণ সংগ্রহের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ছাত্রদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করবে।
এই ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের প্রকাশ্য বিবৃতি অনুসারে, সকল সংশ্লিষ্ট পক্ষকে শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা পুনরাবৃত্তি না হয় তা নিশ্চিত করতে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নতি করা হবে। এছাড়া, ছাত্র ও শিক্ষকমণ্ডলীর মধ্যে পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখতে সচেতনতা বৃদ্ধি কর্মসূচি চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, জাবি ‘হিম উৎসব’ের সময় ঘটিত এই হামলা সাংবাদিকদের কাজের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়কে দ্রুত ও ন্যায়সঙ্গত পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করেছে। তদন্তের ফলাফল এবং প্রয়োগিত শাস্তি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে শৃঙ্খলা ও ন্যায়বিচার রক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সূচক হবে।
এই ঘটনার পর, স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোও বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা প্রদান করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। সকল পক্ষের সহযোগিতায় দ্রুত এবং ন্যায়সঙ্গত সমাধান প্রত্যাশা করা হচ্ছে।



