রোববার বিকেলে মিরপুর‑১০ নম্বর সেনপাড়া আদর্শ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত নির্বাচনী র্যালিতে বিএনপি চেয়ারপার্সন তারেক রহমান জনগণের কাছে স্পষ্ট বার্তা দিয়ে বলেন, তারা এমন কোনো প্রতিশ্রুতি দেবে না যা মানুষের ক্ষমতা ও সাধ্যের বাইরে। তিনি ঢাকার ধানের শীষের (ধা‑১৫) প্রার্থী শফিকুল ইসলাম খান মিল্টনের সমর্থনে উপস্থিত ছিলেন। তারেকের বক্তব্যের মূল উদ্দেশ্য ছিল ভোটারদের আশ্বাস প্রদান যে পার্টি বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনা নিয়ে এসেছে। এই র্যালি দেশের আসন্ন নির্বাচনের তীব্রতা বাড়িয়ে তুলেছে।
রালির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জামায়াত-এ-ইসলামির আমির ডা. শফিকুর রহমান, যিনি একই সময়ে পার্টির প্রচার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছিলেন। দুজনেই ভোটারদের কাছে নিজেদের নীতি ও পরিকল্পনা তুলে ধরতে চেষ্টা করলেও, তারেকের জোর ছিল ‘মানুষের সাধ্যের বাইরে কোনো প্রতিশ্রুতি না’। অন্যদিকে ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্যে পার্টির ধর্মীয় ও সামাজিক নীতি তুলে ধরা হয়। উভয় দলের এই মুখোমুখি আলোচনা নির্বাচনী প্রেক্ষাপটে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
তারেক রহমানের র্যালির আগে তিনি ইসিবি চত্বর থেকে ঢাকা‑১৭ আসনের তার নিজস্ব নির্বাচনী এলাকা থেকে পথসভা শুরু করেন। এই রোডশোতে তিনি স্থানীয় সমস্যাগুলো তুলে ধরে ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করেন। র্যালি শেষে তিনি পল্লবীতে ঢাকা‑১৬ আসনের বিএনপি প্রার্থী আমিনুল হকের সমর্থনে আরেকটি সমাবেশে অংশ নেন। এই ধারাবাহিক র্যালি তারেকের নির্বাচনী প্রচারকে বিস্তৃত করে দেশের বিভিন্ন অংশে পৌঁছাতে সাহায্য করেছে।
পল্লবীর র্যালিতে তারেক আবার জোর দিয়ে বলেন, বিএনপি এমন প্রতিশ্রুতি দেবে না যা বাস্তবায়নযোগ্য নয়। তিনি উল্লেখ করেন, পার্টি এমন নীতি গড়ে তুলবে যা জনগণের হাতে থাকা সম্পদ ও ক্ষমতার মধ্যে সম্পন্ন করা সম্ভব। এই দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি ইহজগতে (অবধি) অপ্রাপ্য কোনো প্রতিশ্রুতি না দেওয়ার কথা পুনরায় জোর দেন। তারেকের এই বক্তব্যে পার্টির স্বচ্ছতা ও বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট হয়।
বিএনপি চেয়ারপার্সন উল্লেখ করেন, ১২ তারিখের নির্বাচন দেশের পুনর্গঠন ও ভাগ্যের পরিবর্তনের সুযোগ হবে। তিনি এটিকে ‘দেশ পুনর্গঠনের নির্বাচন’ বলে অভিহিত করেন এবং ভোটারদেরকে দেশের ভবিষ্যৎ গঠনে অংশ নিতে আহ্বান জানান। তারেকের মতে, এই নির্বাচনের ফলাফল দেশের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি ভোটারদেরকে সচেতনভাবে ভোট দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন।
বিএনপির নির্বাচনী ম্যানিফেস্টোতে নারী, ছাত্র সমাজ, বেকারত্ব ও স্বাস্থ্যসেবার জন্য নির্দিষ্ট পরিকল্পনা উল্লেখ করা হয়েছে। নারী ক্ষমতায়ন, শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সুবিধা, লক্ষ লক্ষ বেকারদের কর্মসংস্থান এবং স্বাস্থ্যসেবার প্রবেশযোগ্যতা বাড়ানোর লক্ষ্য ম্যানিফেস্টোর মূল অংশ। তারেক বলেন, এই পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নের জন্য পার্টি প্রয়োজনীয় নীতি ও বাজেট বরাদ্দ করবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এসব প্রতিশ্রুতি জনগণের বাস্তব চাহিদা থেকে উদ্ভূত।
নারী ক্ষমতায়নের বিষয়ে তিনি উল্লেখ করেন, দেশের জনসংখ্যার অর্ধেকই নারী এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া বহুবার দেশের নারীদের শিক্ষা ব্যবস্থা মুক্ত করার চেষ্টা করেছেন। তার প্রচেষ্টার ফলে এখন বাংলাদেশের মেয়েরা প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। এই নীতি নারীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তারেকের মতে, এই ধারাকে আরও শক্তিশালী করে নারীর স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করা হবে।
বিএনপি সরকার গঠন হলে নারীদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বী করার জন্য পরিবারিক কার্ড বিতরণ পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই কার্ডের মাধ্যমে গৃহিণীরা বিভিন্ন সরকারি সহায়তা ও আর্থিক সেবা পেতে সক্ষম হবে। তারেক বলেন, পরিবারিক কার্ডের মাধ্যমে নারীদের উদ্যোক্তা উদ্যোগে সহায়তা ও ঋণ সুবিধা প্রদান করা হবে। এভাবে নারীরা নিজেরা আয় সৃষ্টির পথে এগিয়ে যাবে। এই পরিকল্পনা নারীর ক্ষমতায়নকে বাস্তবায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত।
কর্মসংস্থান ক্ষেত্রেও বিস্তৃত পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে। দেশের প্রতিটি জেলায় অন্তত একটি ভোকেশনাল ইনস্টিটিউট স্থাপন করা হবে, যেখানে ভাষা শিক্ষা ও বিভিন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে। এই প্রশিক্ষণগুলো তরুণদের স্থানীয় ব্যবসা শুরু করা বা বিদেশে কাজের সুযোগ পেতে সহায়তা করবে। তাছাড়া, প্রশিক্ষণ শেষে চাকরি সৃষ্টির জন্য সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করা হবে। এভাবে বেকারত্বের হার কমিয়ে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখার লক্ষ্য।
সারসংক্ষেপে, তারেক রহমানের র্যালি এবং তার ঘোষিত পরিকল্পনা ভোটারদের কাছে বাস্তবসম্মত ও নাগরিক-কেন্দ্রিক প্রতিশ্রুতি উপস্থাপন করেছে। তিনি পার্টির ম্যানিফেস্টোর মূল বিষয়গুলো—নারী ক্ষমতায়ন, শিক্ষার প্রবেশযোগ্যতা, কর্মসংস্থান ও স্বাস্থ্যসেবা—উল্লেখ করে ভোটারদের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করেছেন। জামায়াত-এ-ইসলামির প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে এই রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা দেশের নির্বাচনী পরিবেশকে তীব্র করেছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে জাতীয় নির্বাচন, যার ফলাফল দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



