রবিবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় অনুষ্ঠিত সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে মুসলিম বিশ্বের বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি (আইইউটি) এবং সিকো ইউনিভার্সিটিজ নেটওয়ার্ক (সান) এর মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষর দেশের শিক্ষাব্যবস্থার রূপান্তরে সহায়ক হবে। এই বক্তব্যের সঙ্গে সঙ্গে তিনি মুসলিম দেশগুলোর টেকসই উন্নয়ন ও সামাজিক অগ্রগতির জন্য শিক্ষায় অধিক সম্পদ বরাদ্দের আহ্বান জানান।
আইইউটি এবং সিকো ইউনিভার্সিটিজ নেটওয়ার্কের মধ্যে সমঝোতা স্মারক দুই প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদী সহযোগিতার ভিত্তি স্থাপন করবে। চুক্তির মাধ্যমে গবেষণা প্রকল্প, একাডেমিক বিনিময় এবং প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন কার্যক্রমের পরিকল্পনা করা হয়েছে। উভয় পক্ষই এই উদ্যোগকে মুসলিম বিশ্বের শিক্ষার মানোন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করছে।
উপদেষ্টা হোসেনের মতে, বর্তমান সময়ে টেকসই উন্নয়ন অর্জনের জন্য শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ অপরিহার্য। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, এই ক্ষেত্রগুলোতে যথাযথ আর্থিক ও মানবসম্পদ সমর্থন না পেলে সামাজিক অগ্রগতি ধীরগতি হবে। তাই, মুসলিম দেশগুলোকে তাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন এবং গবেষণার সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিতে হবে।
মুসলিম বিশ্বের বিশাল মানবসম্পদ এবং সমৃদ্ধ বৌদ্ধিক ঐতিহ্য থাকা সত্ত্বেও, শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে এখনও পিছিয়ে রয়েছে। উপদেষ্টা উল্লেখ করেন যে, এই ঘাটতি দূর করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং জ্ঞান ভাগাভাগি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, আইইউটি ও সান-এর এই অংশীদারিত্বের মাধ্যমে এই ফাঁকটি পূরণ হবে।
টেকসই উন্নয়ন ও সামাজিক অগ্রগতির জন্য অধিক বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা উপর জোর দিয়ে তিনি বললেন, শিক্ষার মানোন্নয়ন সরাসরি দেশের অর্থনৈতিক শক্তি বৃদ্ধি করে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, মুসলিম দেশগুলোকে গবেষণা অবকাঠামো, ডিজিটাল লার্নিং টুল এবং দক্ষ কর্মশক্তি গড়ে তোলার দিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এ ধরনের বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় উন্নয়নের ভিত্তি স্থাপন করবে।
সমঝোতা স্মারককে সময়োপযোগী উদ্যোগ হিসেবে বর্ণনা করে উপদেষ্টা আশা প্রকাশ করেন, এই অংশীদারিত্বের মাধ্যমে যৌথ গবেষণা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর বিনিময় এবং প্রযুক্তিগত ও কারিগরি দক্ষতা ভাগাভাগি সম্ভব হবে। তিনি উল্লেখ করেন, এমন সহযোগিতা ওয়েস্টার্ন ইন্ডিয়ান ওয়েলফেয়ার ইনস্টিটিউটের মতো আন্তর্জাতিক গবেষণা কেন্দ্রের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনেও সহায়তা করবে। ফলে, মুসলিম বিশ্বের একাডেমিক প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক মানের গবেষণায় অংশ নিতে পারবে।
চুক্তির অধীনে যৌথ গবেষণা প্রকল্পগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, যেখানে উভয় প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানী ও গবেষকরা একসঙ্গে কাজ করবেন। এই প্রকল্পগুলোতে নবায়নযোগ্য শক্তি, তথ্যপ্রযুক্তি এবং স্বাস্থ্যসেবার মতো ক্ষেত্রগুলোকে কেন্দ্র করে গবেষণা চালু হবে। ফলস্বরূপ, নতুন উদ্ভাবন এবং পেটেন্টের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে।
শিক্ষক-শিক্ষার্থী বিনিময় প্রোগ্রামও চুক্তির একটি মূল ধারা, যা উভয় প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা অর্জনে সহায়তা করবে। শিক্ষার্থীরা এক সেমিস্টার বা এক বছর অন্য দেশের ক্যাম্পাসে পড়াশোনা করতে পারবে, যা তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বিস্তৃত করবে। একই সঙ্গে, শিক্ষকরা গবেষণা ও পাঠ্যক্রম উন্নয়নে পারস্পরিক সহযোগিতা করতে পারবেন।
প্রযুক্তিগত ও কারিগরি দক্ষতা ভাগাভাগি অংশে, সিকো ইউনিভার্সিটিজ নেটওয়ার্কের সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের প্রশিক্ষণ মডেল ও কর্মশালার নীতি আইইউটির সঙ্গে শেয়ার করবে। এই সহযোগিতা স্থানীয় শিল্পের চাহিদা মেটাতে দক্ষ কর্মী তৈরি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ফলে, যুবকদের কর্মসংস্থান সম্ভাবনা বাড়বে এবং দেশীয় উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে।
উপদেষ্টা আরও উল্লেখ করেন, এই ধরনের অংশীদারিত্ব ওয়েস্টার্ন ইন্টারন্যাশনাল কমিটি (ওআইসি) সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সহযোগিতা জোরদার করবে। একসঙ্গে কাজ করার মাধ্যমে জ্ঞান, সম্পদ এবং প্রযুক্তি বিনিময় সহজ হবে। এভাবে, মুসলিম বিশ্বের সমষ্টিগত উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করবে।
চুক্তি স্বাক্ষরে আইইউটির ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম এবং সিকো ফাউন্ডেশনের নির্বাহী চেয়ারম্যান ও সান সদস্য সালাহউদ্দিন কাসেম খান প্রতিনিধিত্ব করে স্বাক্ষর করেন। উভয় পক্ষই চুক্তির শর্তাবলী নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার জন্য প্রস্তুতির কথা জানান। স্বাক্ষরের মুহূর্তে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়ামও, যিনি অনুষ্ঠানে সমর্থন জানিয়ে উভয় প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগকে প্রশংসা করেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত অন্যান্য সরকারি ও বেসরকারি প্রতিনিধিরা এই চুক্তিকে মুসলিম বিশ্বের শিক্ষার উন্নয়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে স্বীকৃতি দেন। তারা প্রত্যাশা প্রকাশ করেন যে, এই ধরনের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা দেশের শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত মান বাড়াবে। এছাড়া, তারা ভবিষ্যতে আরও সমন্বিত প্রকল্পের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন।
এই চুক্তি থেকে উদ্ভূত সম্ভাব্য সুবিধাগুলোকে কাজে লাগাতে শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং গবেষকরা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করা জরুরি। উদাহরণস্বরূপ, শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামের জন্য আবেদন করতে পারে, আর শিক্ষকরা যৌথ গবেষণার জন্য তহবিল অনুসন্ধান করতে পারেন। এভাবে, ব্যক্তিগত এবং সমষ্টিগতভাবে শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব হবে।
পাঠকদের জন্য ব্যবহারিক টিপস: যদি আপনি শিক্ষার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা খুঁজছেন, তবে আইইউটি ও সিকো নেটওয়ার্কের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক্সচেঞ্জ ও গবেষণা সুযোগগুলো নিয়মিত অনুসরণ করুন। এছাড়া, আপনার প্রতিষ্ঠানকে এই ধরনের চুক্তির সুবিধা সম্পর্কে জানিয়ে সহযোগিতা বাড়াতে পারেন। আপনি কি আপনার ক্যারিয়ার বা গবেষণায় আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে প্রস্তুত?



