ঢাকা, ১০ ফেব্রুয়ারি – ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এর নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান গত সোমবার ধানমন্ডি কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ‘গণভোট ও প্রাক‑নির্বাচন পরিস্থিতি’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের রাতের বেলা অফিস থেকে ‘ধরে নেওয়া’কে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য বলে নিন্দা করেন। তিনি উল্লেখ করেন, কোনো স্পষ্ট অভিযোগ ছাড়া একসাথে কর্মীকে তুলে নেওয়া মুক্ত সাংবাদিকতার জন্য হিংসাত্মক দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করে।
সেই একই সপ্তাহে, ঢাকা নিকুঞ্জ এলাকায় অবস্থিত বাংলাদেশ টাইমসের অফিসে রাত ১০টার দিকে একদল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যের হস্তক্ষেপে ২১ জন সাংবাদিককে ‘ধরে নেওয়া’ হয়। ঘটনাটি প্রথমে বাংলাদেশ টাইমসের ফেসবুক পেজে পোস্টের মাধ্যমে প্রকাশ পায়, যেখানে বলা হয় অফিস ঘেরাও করে সেনা সদস্যরা সাংবাদিকদের তুলে নিয়েছেন।
পরবর্তীতে, বাংলাদেশ টাইমসের মোবাইল জার্নালিজম বিভাগের সম্পাদক সাব্বির আহমেদ ফেসবুক লাইভে জানালেন, নিকুঞ্জের অফিস থেকে ২১ জন কর্মীকে ‘ধরে নেওয়া’ হয়েছে এবং কয়েক ঘণ্টা পর সব কর্মীকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, কোনো কর্মীকে দীর্ঘ সময়ের জন্য আটক করা হয়নি, তবে ঘটনাটির সঠিক কারণ ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
ইন্টারন্যাশনাল সেনাবাহিনীর জনসংযোগ বিভাগ (ISPR) থেকে এই ঘটনার বিষয়ে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তদুপরি, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশিত হয়নি, ফলে ঘটনাটির পেছনের উদ্দেশ্য ও প্রক্রিয়া স্পষ্ট হয়নি।
টিআইবি নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান জোর দিয়ে বললেন, কোনো সংবাদে আপত্তি থাকলে যথাযথ আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতি অনুসরণ করা উচিত। তিনি উল্লেখ করেন, যদিও সাংবাদিকদের পরে অফিসে ফিরে পাঠানো হয়েছে, তবু এই ধরনের কাজ পুরো গণমাধ্যমের ওপর ভীতিমূলক বার্তা পাঠায়। তিনি আরও উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীসহ সকল সংস্থাকে এ ধরনের হিংসাত্মক পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকতে হবে।
ইফতেখারুজ্জামান অতীতের কিছু ঘটনার সঙ্গে তুলনা করে বলেন, ১৮ জানুয়ারি প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগের পর একই ধরনের হিংসা ও ভয় দেখানোর প্রবণতা দেখা গেছে। তিনি উল্লেখ করেন, সেই সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছিল এবং এখনও সাংবাদিক স্বাধীনতার ওপর চাপ বাড়ছে।
টিআইবি এই ঘটনাকে বাংলাদেশের মুক্ত সাংবাদিকতার জন্য ‘অত্যন্ত নেতিবাচক ও সহিংসতার দৃষ্টান্ত’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, গণমাধ্যমের ওপর ভীতিমূলক পরিবেশ তৈরি করা কোনো সংস্থার স্বার্থে নয়, বরং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। তাই সকল সংস্থার উচিত স্বচ্ছতা ও আইনি পদ্ধতি মেনে চলা।
বিশেষজ্ঞরা ইঙ্গিত করছেন, এই ধরনের ঘটনা দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে অতিরিক্ত উত্তেজনা যোগ করতে পারে, বিশেষ করে আসন্ন নির্বাচন ও প্রাক‑নির্বাচন পর্যায়ে। সাংবাদিকদের ওপর চাপ বাড়লে তথ্যের স্বচ্ছতা হ্রাস পাবে, যা ভোটারদের সচেতন সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করবে। তাই সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার দ্রুত তদন্ত ও স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া জরুরি।
টিআইবি এর এই নিন্দা ও আহ্বানকে কেন্দ্র করে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্তের সূচনা হয়নি, তবে সাংবাদিক সংস্থাগুলি এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে আইনি পদক্ষেপের সম্ভাবনা প্রকাশ করেছে। ভবিষ্যতে যদি এধরনের হস্তক্ষেপ অব্যাহত থাকে, তবে তা দেশের আন্তর্জাতিক সুনাম ও প্রেস ফ্রিডম সূচকে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, ঢাকা নিকুঞ্জে সাংবাদিকদের ‘ধরে নেওয়া’ এবং টিআইবি এর তীব্র নিন্দা দেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের দ্রুত ও স্বচ্ছ পদক্ষেপের মাধ্যমে এই ধরনের হিংসাত্মক দৃষ্টান্তের পুনরাবৃত্তি রোধ করা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ গড়ে তোলা জরুরি।



