আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল‑১-এ (আইসিটি‑১) রোববার সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া দুই ঘণ্টা দীর্ঘ সাক্ষ্য দিলেন। তিনি ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’ অভিযানে জড়িত কর্মকর্তাদের ওপর দেওয়া দায়মুক্তি সিদ্ধান্তকে “হত্যার লাইসেন্স” হিসেবে বর্ণনা করেন। একই সাক্ষ্যে তিনি ডিজিএফআই (DGFI) কর্তৃক বিএনপি-জামাত জোট সরকারের সময়ে করা গুম‑খুনের ঘটনাগুলোরও উল্লেখ করেন, যার মধ্যে বিএনপির জনাব তারেক রহমানের ওপর নির্যাতন অন্তর্ভুক্ত।
ট্রাইব্যুনালের দুই সদস্যের বেঞ্চে বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদার প্রধান এবং বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ সহ উপস্থিত ছিলেন। ভূঁইয়া, যাকে আইকেবি নামেও চেনা যায়, ২৫ জুন ২০১২ থেকে ২৫ জুন ২০১৫ পর্যন্ত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি সাক্ষ্যে বলেন, সেনাবাহিনীর মধ্যে “খুনের সংস্কৃতি” স্বাধীনতার পর থেকেই বিদ্যমান, আর গুমের সংস্কৃতি পরে গড়ে উঠেছে।
ইকবাল করিম ভূঁইয়া উল্লেখ করেন, ২০০৮ সাল থেকে খুনের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে ধারণা করা ভুল। তিনি বলেন, “স্বাধীনতার পর থেকেই বিভিন্ন সময়ে আইন‑শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য সেনাবাহিনীকে সেনানিবাসের বাইরে মোতায়েন করা হয়েছে। সেই সময়ে সন্দেহভাজনদের সেনাক্যাম্পে এনে জিজ্ঞাসাবাদে নির্যাতন করা হয়েছে, যার ফলে কিছু ব্যক্তির মৃত্যু ঘটেছে।” তবে তিনি এ সংখ্যাকে “সীমিত” বলে উল্লেখ করেন এবং পরবর্তীতে তদন্ত আদালত ও আইন প্রয়োগের মাধ্যমে এসব ঘটনার নিয়মিত রেকর্ড তৈরি করা হয়েছে বলে জানান।
পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর অভিযান চলাকালে ঘটিত মৃত্যুর ক্ষেত্রে, ভূঁইয়া দাবি করেন যে, সংশ্লিষ্ট মামলাগুলো তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে এবং দায়ী ব্যক্তিদের যথাযথ শাস্তি দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “প্রশিক্ষণকালে সেনা সদস্যদের ডিহিউম্যানাইজ করা হয়, যাতে তারা ধীরে ধীরে মানুষকে মানুষ হিসেবে না দেখে, বরং টার্গেট হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করে। ফায়ারিং রেঞ্জে মানুষ আকৃতির টার্গেটের উপর গুলি করা হয়, যা মানবিক মূল্যবোধের ক্ষয় ঘটায়।”
সাক্ষ্যের সময় তিনি আরও উল্লেখ করেন, ডিজিএফআই কর্তৃক গুম‑খুনের মামলায় রোববারের জবানবন্দি ট্রাইব্যুনালের রায়ের পরই এই বক্তব্য প্রদান করা হয়েছে। তিনি বলেন, “ডিজিএফআই’র হাতে গুম‑খুনের ঘটনা মানবতাবিরোধী অপরাধের শিরোনামে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হয়েছে, তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপর দেওয়া দায়মুক্তি সিদ্ধান্তে একটি বিপজ্জনক পূর্বধারণা তৈরি হয়েছে।”
ইকবাল করিম ভূঁইয়া সাক্ষ্যে উল্লেখ করেন, “অপারেশন ক্লিন হার্ট” নামের অভিযানে জড়িত কর্মকর্তাদের ওপর দেওয়া অমার্জিত অব্যাহতি, যা সরকারী নীতি হিসেবে গৃহীত হয়েছিল, তা বাস্তবে “হত্যার লাইসেন্স” হিসেবে কাজ করেছে। তিনি অতিরিক্তভাবে বলেন, “যদি আমরা এই ধরনের অব্যাহতি চালিয়ে যাই, তবে সেনাবাহিনীর মধ্যে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সংস্কৃতি আরও গভীর হবে।”
আইসিটি‑১‑এর বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদার রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে যে, গুম‑খুনের মামলায় সংশ্লিষ্ট সকল দায়িত্বশীলকে আইনি দায়িত্বে টানা হবে। ট্রাইব্যুনালের রায়ের পরবর্তী পর্যায়ে, তদন্তের ফলাফল ও শাস্তি প্রয়োগের প্রক্রিয়া কীভাবে এগোবে তা নির্ধারিত হবে।
সামগ্রিকভাবে, ইকবাল করিম ভূঁইয়ার সাক্ষ্য সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ সংস্কৃতি, গুম‑খুনের ঘটনা এবং “অপারেশন ক্লিন হার্ট”‑এর পরিণতি সম্পর্কে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করেছে। তিনি পুনরায় জোর দিয়ে বলেন, “সেনাবাহিনীর কাজের পদ্ধতি যদি মানবিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তবে তা দেশের নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সুনাম উভয়ের জন্য ক্ষতিকর।”
এই সাক্ষ্য আইসিটি‑১‑এর পরবর্তী শুনানিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং গুম‑খুন ও অব্যাহতি সংক্রান্ত আইনি প্রক্রিয়ার দিকনির্দেশনা নির্ধারণে সহায়তা করবে। ভবিষ্যতে সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর ফলাফল দেশের মানবাধিকার নীতি ও নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে।



