দুবাই ভিত্তিক গ্লোবাল অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ড এবং চট্টগ্রাম বন্দরের নিউ মুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) এর ইজারা চুক্তি বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে সম্পন্ন হবে না বলে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক বিন হারুন রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) ঢাকার ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে অনুষ্ঠিত ব্রিফিং‑এ জানিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, ডিপি ওয়ার্ল্ড সরকারকে চিঠি দিয়ে আলোচনার অগ্রগতির প্রশংসা করেছে, তবে খসড়া কনসেশন চুক্তি পর্যালোচনার জন্য অতিরিক্ত সময় চেয়েছে, ফলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্বাচনের পরের সরকারই নেবে।
আশিক বিন হারুনের মতে, বর্তমান সরকারের মেয়াদে আলোচনার গতি সীমিত এবং নির্বাচনের পর পর্যন্ত প্রক্রিয়া স্থগিত হতে পারে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বাস্তবিক দৃষ্টিকোণ থেকে চুক্তি গঠন ও অনুমোদন প্রক্রিয়া নির্বাচনের পরের সরকারে এগিয়ে নেওয়া হবে। এদিকে ডিপি ওয়ার্ল্ডের চিঠিতে আলোচনাকে ‘সঠিক পথে’ এগিয়ে যাওয়ার আশাবাদ প্রকাশ করা হয়েছে।
বিডা প্রধান আরও স্পষ্ট করে জানান, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) কর্তৃপক্ষ কোনো বাণিজ্যিক অংশীদার নয়; এটি কনসেশন চুক্তি গঠনের সময় সরকার ও বিদেশি কোম্পানির মধ্যে সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করে। গভার্নমেন্ট‑টু‑গভার্নমেন্ট (জি‑টু‑জি) আলোচনার প্রথম ধাপ হিসেবে দুই দেশের সরকার সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষর করে, এরপর সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা ও অংশীদার দেশের মনোনীত কোম্পানির মধ্যে প্রকল্পভিত্তিক পিপিপি আলোচনার সূচনা হয়।
পিপিপি কর্তৃপক্ষের সমন্বয়কারী ভূমিকা নিয়ে আশিক বিন হারুন উল্লেখ করেন, তিনি একইসঙ্গে পিপিপি কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেন। তিনি বলেন, ডিপি ওয়ার্ল্ড একটি সম্পূর্ণ রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান এবং চুক্তির প্রতিটি ধাপে সরকারী সমন্বয় অব্যাহত রয়েছে। এনসিটি প্রকল্পের আলোচনাটি ২০১৯ সাল থেকে চালু এবং সম্প্রতি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে।
গত এক মাসে এনসিটি প্রকল্পের আলোচনায় সবচেয়ে তীব্র ও গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে প্রবেশ করা হয়েছে। আশিক বিন হারুন উল্লেখ করেন, এমন বড় কনসেশন চুক্তি চূড়ান্ত করতে সময়ের প্রয়োজন স্বাভাবিক, এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডের চিঠিতে প্রকাশিত আশাবাদই বর্তমান প্রক্রিয়ার মূল চালিকাশক্তি।
ডিপি ওয়ার্ল্ডের চিঠিতে উল্লেখিত সময়সীমা অনুযায়ী, খসড়া চুক্তি পর্যালোচনার জন্য অতিরিক্ত সময় চাওয়া হয়েছে, যা বাস্তবিকভাবে বর্তমান সরকারের সীমিত কার্যদিবসের মধ্যে সম্ভব নয়। ফলে আলোচনার গতি নির্বাচনের পরের সময় পর্যন্ত স্থগিত হতে পারে, যা ভবিষ্যতে নতুন সরকারের নীতি ও অগ্রাধিকারের ওপর নির্ভরশীল হবে।
বিডা কর্তৃক প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, পিপিপি কোনো আর্থিক ঝুঁকি গ্রহণ করে না; এটি কেবল সরকারী নীতি ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে। তাই ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন হলে, প্রকল্পের অর্থায়ন ও পরিচালনা সম্পূর্ণভাবে ডিপি ওয়ার্ল্ডের দায়িত্বে থাকবে, আর বাংলাদেশ সরকার টার্মিনালের অবকাঠামো ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো নিশ্চিত করবে।
চুক্তি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত নিউ মুরিং টার্মিনালের উন্নয়ন ও কার্যক্রমে কোনো পরিবর্তন হবে না। বর্তমান সময়ে চট্টগ্রাম বন্দরের সামগ্রিক কন্টেইনার হ্যান্ডলিং ক্ষমতা বৃদ্ধি পেতে পারে না, যা বাণিজ্যিক শিপিং লাইন ও রপ্তানি-আমদানি ব্যবসায়িক সংস্থার জন্য সম্ভাব্য দেরি সৃষ্টি করতে পারে।
অন্যদিকে, ডিপি ওয়ার্ল্ডের মতো আন্তর্জাতিক অপারেটরের অংশগ্রহণ দেশের লজিস্টিকস সেক্টরের আধুনিকায়ন ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করতে পারে বলে বিশ্লেষকরা পূর্বে ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত এই সুবিধা বাস্তবায়িত হবে না, ফলে বিনিয়োগের প্রত্যাশা ও বাজারের প্রত্যাশা দুটোই অনিশ্চিত রয়ে যায়।
বিডা প্রধানের মতে, নির্বাচনের পরের সরকার যদি এই চুক্তি চালু করে, তবে চট্টগ্রাম বন্দরের কন্টেইনার টার্মিনাল আধুনিকীকরণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হবে এবং দেশের রপ্তানি-আমদানি ব্যয় কমে যাবে। তবে নতুন সরকারের নীতি দিকনির্দেশনা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং আর্থিক সক্ষমতা এই চুক্তির বাস্তবায়নকে নির্ধারণ করবে।
সারসংক্ষেপে, ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে এনসিটি ইজারা চুক্তি বর্তমান সরকারের সময়সীমা অতিক্রম করে নির্বাচনের পরের সরকারে হস্তান্তর হবে। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক বিন হারুনের বক্তব্য অনুযায়ী, পিপিপি প্রক্রিয়া সরকারী সমন্বয় বজায় রেখে চুক্তি চূড়ান্ত করার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তবে চূড়ান্ত অনুমোদন ও বাস্তবায়ন নির্বাচনের পরের সময়ের ওপর নির্ভরশীল।



