বাংলাদেশ ব্যাংক সোমবার বিকাল ১১টায় গভার্নর আহসান এইচ. মনসুরের নেতৃত্বে বছরের প্রথম ছয় মাসের মুদ্রানীতি প্রকাশ করেছে। এই ঘোষণায় মুদ্রা সরবরাহ, সুদের হার এবং তরলতা ব্যবস্থার মূল দিকগুলো নির্ধারিত হয়েছে। নীতি প্রণয়নের পেছনে মূল লক্ষ্য ছিল চলমান মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা।
মুদ্রানীতি প্রতি ছয় মাসে একবার প্রকাশ করা হয়, এবং এইবারের নীতি জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত কার্যকর হবে। সরকারী আর্থিক পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাজারে অর্থের পরিমাণ নির্ধারণের জন্য এই নীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের পরামর্শ অনুসারে, মুদ্রাস্ফীতি ৭ শতাংশের নিচে নেমে না আসা পর্যন্ত নীতি সুদের হার কমানো উচিত নয়। এই নির্দেশনা অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংক আগামী ছয় মাসের জন্য সংকোচনমুখী নীতি বজায় রাখবে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে।
২০২৪ সালের শেষের দিকে ব্যাংক ইতিমধ্যে সংকোচনমূলক নীতি গ্রহণ করে ছিল। সর্বশেষ ঘোষিত নীতিতে নীতি সুদের হার ১০ শতাংশ নির্ধারিত হয়েছে, একই সঙ্গে স্বল্পমেয়াদী লিকুইডিটি ফ্যাসিলিটি (SLF) হার ১১.৫ শতাংশ এবং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (SDF) হার ৮ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
ডলারের তুলনায় টাকার মান হ্রাসের ফলে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মুদ্রাস্ফীতি দ্রুত বাড়ে এবং ৯.৫২ শতাংশে পৌঁছায়। আগের মাসে, অর্থাৎ আগস্টে, মুদ্রাস্ফীতি ৭.৫৬ শতাংশে ছিল। এই উত্থান থামাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২২ সালের শেষের দিকে নীতি সুদের হার বাড়াতে শুরু করে।
সুদের হার বাড়ানোর পরেও মুদ্রাস্ফীতি অব্যাহতভাবে বৃদ্ধি পায় এবং জুলাই ২০২৪-এ ১১.৬৬ শতাংশে পৌঁছায়। একই মাসে ছাত্রদের প্রতিবাদ সরকারী নীতির বিরোধে রূপ নেয় এবং পরের মাসে রাজনৈতিক অশান্তি বাড়ে। ৫ আগস্ট, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং সম্পূর্ণ সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি চালু করে।
অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে মুদ্রাস্ফীতি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে এবং আগস্ট ২০২৪-এ হ্রাসের প্রবণতা দেখা যায়। পরবর্তী মাসগুলোতে মুদ্রাস্ফীতি হ্রাস অব্যাহত থাকে, এবং অক্টোবর ২০২৫-এ ৮.১৭ শতাংশে নেমে আসে। তবে জানুয়ারি মাসে আবার তিন মাসের ধারাবাহিক বৃদ্ধি পেয়ে ৮.৫৮ শতাংশে পৌঁছায়।
মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ধারাবাহিক সংকোচনমূলক নীতি বজায় রাখা এবং সুদের হার স্থিতিশীল রাখা ভবিষ্যতে মুদ্রা বাজারের স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের পরামর্শ অনুসরণ করে, বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদের হার কমাতে না গিয়ে মুদ্রাস্ফীতি লক্ষ্যমানের নিচে নামা পর্যন্ত কঠোর পদক্ষেপ চালিয়ে যাবে।
এই নীতি ঘোষণার ফলে আর্থিক বাজারে স্বল্পমেয়াদে তরলতা সীমিত হতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। বিনিয়োগকারী এবং ব্যবসায়িক সংস্থাগুলোকে এই সংকোচনমূলক দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী তাদের কৌশল পুনর্বিবেচনা করতে হবে।
সারসংক্ষেপে, বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন মুদ্রানীতি মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপের ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে, নীতি সুদের হার ১০ শতাংশে স্থির থাকবে এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সুপারিশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। বাজারের স্থিতিশীলতা ও মুদ্রার মান রক্ষার জন্য এই নীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।



