আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম রবিবার দুপুরে ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় জানিয়েছেন, আজকের শুনানি বাংলাদেশের বিচার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। তিনি গুম-খুন মামলায় সিরিয়াল কিলার হিসেবে পরিচিত এক উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তার বিচার চলমান হওয়াকে উল্লেখ করে এই দিনকে দেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দিন বলে বর্ণনা করেছেন।
এই মামলায় প্রধান সাক্ষী হিসেবে সাবেক সেনাপ্রধান (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া উপস্থিত হয়েছেন। তিনি মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে গুম-খুনের অভিযোগে প্রথম সাক্ষ্য প্রদান করেন। ভূঁইয়া আদালতে বলপূর্বক অপহরণ, গুম এবং হত্যার অভিযোগের বিশদ তুলে ধরেছেন, যা প্রোসিকিউশনের মূল দাবিগুলোর ভিত্তি গঠন করে।
ইকবাল করিম ভূঁইয়া, যাকে দেশের সামরিক ইতিহাসে মেধাবী ও দূরদর্শী হিসেবে স্মরণ করা হয়, তার সাক্ষ্যে তিনি উল্লেখ করেন, কীভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্বকে ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করা হয়েছে। তিনি বলেন, সেনাবাহিনীকে রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন, তবে তার প্রচেষ্টাকে বাধা দেওয়ার জন্য কিছু রাজনৈতিক গোষ্ঠী একটি চক্র গঠন করে।
সেই চক্রের মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তারিক আহমেদ সিদ্দিকের নেতৃত্বে গঠিত একটি গোষ্ঠী রয়েছে, যা ভূঁইয়ার উদ্যোগকে ব্যর্থ করতে নানা কৌশল অবলম্বন করেছে। তিনি আদালতে তুলে ধরেছেন, কীভাবে এই গোষ্ঠী সেনাবাহিনীর স্বায়ত্তশাসনকে সীমিত করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে এবং তার ফলে সেনাবাহিনীর কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটেছে।
অধিকন্তু, ভূঁইয়া উল্লেখ করেন, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা পদ সৃষ্টি করে একটি ডিপ স্টেট গঠন করা হয়েছে। এই পদটি মূল সেনাবাহিনীর কমান্ডের বাইরে একটি আলাদা কমান্ড কাঠামো গড়ে তুলেছে, যা বিভিন্ন অপরাধমূলক কার্যক্রমে ব্যবহৃত হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। এই কাঠামোর মাধ্যমে সেনাবাহিনীর কিছু অংশকে নিয়ন্ত্রিত করে গুম-খুনের মতো গুরুতর অপরাধে যুক্ত করা হয়েছে।
ইকবাল করিম ভূঁইয়া, যিনি সেই সময়ে কর্নেল জিয়া নামে পরিচিত ছিলেন, তিনি আদালতে তার নিজের কর্মকাণ্ডের বিশদও উপস্থাপন করেন। তিনি স্বীকার করেন, গুম-খুনের সময় তিনি কীভাবে মানুষকে হত্যা করেছেন, তার দক্ষতা ও বেপরোয়া মনোভাব কীভাবে কাজ করেছে, তা তিনি স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেন। এই স্বীকারোক্তি মামলার প্রমাণভিত্তিক দিককে আরও দৃঢ় করে।
ট্রাইব্যুনালের পরবর্তী শুনানির তারিখ আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে নির্ধারিত হয়েছে। আদালত উভয় পক্ষকে অতিরিক্ত প্রমাণ ও সাক্ষ্য উপস্থাপনের সুযোগ দেবে, যাতে মামলার সকল দিক সম্পূর্ণভাবে বিশ্লেষণ করা যায়। প্রোসিকিউশন দল ইতিমধ্যে অতিরিক্ত গুম-খুনের মামলায় জড়িত অন্যান্য কর্মকর্তাদের নাম তালিকাভুক্ত করেছে, যা ভবিষ্যতে আরও তদন্তের সূচনা করতে পারে।
এই মামলায় বিচারাধীন ব্যক্তিরা, যার মধ্যে জিয়াউল আহসানও অন্তর্ভুক্ত, তাদের বিরুদ্ধে গুম-খুনের অভিযোগের ভিত্তিতে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে চিফ প্রসিকিউটর জোর দিয়ে বলেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, যদি এই ধরনের অপরাধের জন্য যথাযথ শাস্তি না দেওয়া হয়, তবে দেশের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার ব্যবস্থার ওপর গুরুতর প্রভাব পড়বে।
সামগ্রিকভাবে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এই শুনানি বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা ও মানবাধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলামের মতে, আজকের বিচার দেশের ইতিহাসে একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে, যা ভবিষ্যতে অনুরূপ অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের ভিত্তি হবে।



