বাংলাদেশ সরকার ২০৩৫ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং কোম্পানি থেকে মোট ১৪টি উড়োজাহাজ ক্রয় করার সিদ্ধান্ত প্রকাশ করেছে। এই ঘোষণা ৮ ফেব্রুয়ারি রবিবার দুপুরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো এবং দেশের বিমান যাত্রী পরিবহন ক্ষমতা বৃদ্ধি এই দুইটি মূল লক্ষ্য। তিনি বলেন, এ পদক্ষেপের মাধ্যমে বিমান শিল্পে স্বনির্ভরতা বাড়িয়ে আয়াত-ব্যয় ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব হবে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে আকাশপথে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ যাত্রী চলাচল করার প্রত্যাশা রয়েছে, তবে বর্তমান সময়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স মাত্র ২০ লাখ যাত্রী পরিবহন করেছে। পর্যাপ্ত উড়োজাহাজের অভাবে প্রায় দেড় কোটি যাত্রী দেশের বিমান সেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
বর্তমানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মোট ১৪টি সচল উড়োজাহাজ রয়েছে, যা বাড়তে থাকা চাহিদা মেটাতে অক্ষম। উপদেষ্টা বশিরউদ্দীন জানান, এই ফাঁক পূরণে অতিরিক্ত বিমান যোগ করা জরুরি, নইলে ভবিষ্যতে সেবা মানের হ্রাস এবং আয়তন হ্রাসের ঝুঁকি বাড়বে।
বিশ্লেষকরা অনুমান করেন, ২০৩৫ সালের মধ্যে দেশের মোট উড়োজাহাজের সংখ্যা কমপক্ষে ৪৭টি হতে হবে। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রাথমিকভাবে ১৪টি নতুন বোয়িং উড়োজাহাজের ক্রয় পরিকল্পনা করা হয়েছে, যা বাকি ৩৩টি বিমান ক্রয়ের জন্য ভিত্তি স্থাপন করবে।
ক্রয় প্রক্রিয়ার নেতৃত্বে ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদকে প্রধান করে একটি নেগোশিয়েশন টিম গঠন করা হয়েছে। টিমটি মূল্যের আলোচনা, চুক্তির শর্তাবলী এবং ডেলিভারির সময়সূচি নির্ধারণে কাজ করবে।
প্রাথমিক অনুমান অনুযায়ী, ১৪টি উড়োজাহাজের মোট মূল্য ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকার মধ্যে হতে পারে। এই পরিমাণ ১০ থেকে ২০ বছরের মধ্যে কিস্তিতে পরিশোধের পরিকল্পনা করা হয়েছে, যেখানে প্রতি বছর প্রায় দেড় থেকে দুই হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করা হবে।
আর্থিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বার্ষিক রপ্তানি আয় এক লাখ কোটি টাকার বেশি, যা কিস্তি পরিশোধের জন্য যথেষ্ট আয় নিশ্চিত করে। তবে দীর্ঘমেয়াদী ঋণসেবা এবং মুদ্রা পরিবর্তনের ঝুঁকি বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বাণিজ্যিকভাবে, এই ক্রয় বাংলাদেশ সরকারের বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে সহায়তা করবে, কারণ উড়োজাহাজের বড় অংশের জন্য পেমেন্টে রপ্তানি আয় ব্যবহার করা হবে। একই সঙ্গে, বিমান শিল্পে আধুনিক প্রযুক্তি ও রক্ষণাবেক্ষণ দক্ষতা আনা যাবে, যা স্থানীয় কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
অন্যদিকে, বড় অঙ্কের ঋণ গ্রহণ এবং দীর্ঘমেয়াদী কিস্তি পরিশোধের ফলে আর্থিক চাপ বাড়তে পারে। ডেলিভারি সময়সূচি যদি বিলম্বিত হয়, তবে পরিকল্পিত ক্ষমতা বৃদ্ধি প্রত্যাশা পূরণে দেরি হতে পারে। এছাড়া, বৈশ্বিক বিমান বাজারের দামের ওঠানামা এবং মুদ্রা হারের পরিবর্তনও প্রকল্পের লাভজনকতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজের ক্রয় বাংলাদেশকে আঞ্চলিক বিমান বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে নিয়ে আসতে পারে। যদি সময়মতো ডেলিভারি এবং কার্যকরী রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত হয়, তবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ক্যারিয়ার বৃদ্ধি পাবে এবং দেশের বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষা পাবে।
অবশেষে, সরকার এই উদ্যোগকে দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্ক মজবুত করার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে উপস্থাপন করেছে। ভবিষ্যতে উড়োজাহাজের সংখ্যা বাড়িয়ে আকাশপথে যাত্রী সেবার গুণগত মান উন্নত করা এবং বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাস করা এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য রয়ে যাবে।



