গুম-খুন গৃহহত্যা মামলার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল‑১-এ রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিলেন। তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদার ও সহবিচারক মো. শফিউল আলম মাহমুদের সামনে তার বক্তব্য রাখেন।
ইকবাল করিম ভূঁইয়া জানান, ২০০৭ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে ডিএফআই (ডিরেক্টরেট অব ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স) কার্যত দেশের নিরাপত্তা সংস্থার শীর্ষে ছিল এবং বিভিন্ন সময়ে বেসামরিক নাগরিক, মন্ত্রী ও রাজনৈতিক নেতাদের গোপনে তুলে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ ও নির্যাতনের শিকার করে। তিনি উল্লেখ করেন, এই সময়ে ডিএফআইয়ের সেলগুলোতে আটক করা ব্যক্তিদের ওপর যে কোনো ধরনের আচরণ করা হতো, যা সংস্থার অভ্যন্তরে স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিল।
বেসামরিক ব্যক্তিদের অপ্রয়োজনীয়ভাবে গ্রেফতার করে সেলগুলোতে রাখার প্রক্রিয়া এক পর্যায়ে অভ্যাসে রূপান্তরিত হয়, ফলে যেকোনো ব্যক্তিকে ইচ্ছামতো আচরণ করা সম্ভব হয়ে ওঠে, এ কথা তিনি জবানবন্দিতে জোর দিয়ে বললেন। এই প্রক্রিয়ার ফলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিজেদের কাজের নিয়ন্ত্রণ হারাতে শুরু করেন এবং মানবিক সীমা অতিক্রম করে।
ইকবাল করিম ভূঁইয়া আরও উল্লেখ করেন, সেই সময়ে বহু মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যের নির্দেশে তারেক রহমান নামের এক ব্যক্তি ডিএফআইয়ের সেলে নিয়ে অমানবিক নির্যাতনের শিকার হন। তিনি বলেন, এই ঘটনা ডিএফআইয়ের দমনমূলক নীতি এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের স্পষ্ট উদাহরণ।
অপারেশন ক্লিন হার্টের প্রসঙ্গেও তিনি মন্তব্য করেন। ২০০৩ সালে র্যাব গঠনের পূর্বে চালিত এই অভিযানে সরকারী সূত্রে অন্তত ১২ জন ‘হার্ট অ্যাটাক’ে মারা গেছেন বলে জানানো হয়। তবে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তথ্য অনুযায়ী মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ৬০ পর্যন্ত পৌঁছেছে। পরবর্তীতে অভিযানে জড়িতদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়, যা তিনি ‘লাইসেন্স টু কিল’ সমতুল্য হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।
ট্রাইব্যুনালের শুনানির সূচনা বক্তব্যে প্রসিকিউটর গাজী এম. এইচ. তামিম প্রধান ভূমিকা পালন করেন। তার সঙ্গে প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, শাইখ মাহদী এবং অন্যান্য আইনগত প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। অভিযুক্ত পক্ষের আইনজীবী হিসেবে নাজনীন নাহার ও মুনসুরুল হক চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।
গত ১৪ জানুয়ারি ট্রাইব্যুনাল‑১-এ মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেয়া হয়। একই আদেশে ৮ ফেব্রুয়ারি দিনটি সূচনা বক্তব্য ও সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য নির্ধারিত হয়, ফলে ইকবাল করিম ভূঁইয়া প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন।
এই সাক্ষ্য ডিএফআইয়ের অতীত কার্যক্রম, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং অপারেশন ক্লিন হার্টের পরিণতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উন্মোচন করে। ট্রাইব্যুনালের পরবর্তী পর্যায়ে অতিরিক্ত সাক্ষী ও প্রমাণ উপস্থাপনের মাধ্যমে মামলার পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা হবে, যা দেশের মানবাধিকার রেকর্ডের পুনর্মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



