ঢাকা, রবিবার – সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার, নির্বাচনী সংস্কার কমিশন ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে সদস্য হিসেবে কাজ করার পরও বর্তমান অন্তবর্তী সরকারের অংশ ছিলেন না, এমন স্পষ্ট বক্তব্য দেন। তিনি আজ সকালে রাজধানীর একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত ‘অঙ্গীকার থেকে বাস্তবায়ন: রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে এই কথা বলেন। অনুষ্ঠানটি সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজন করেছে এবং উপস্থিতদের সামনে তিনি সরকারের সঙ্গে তার সম্পর্কের প্রকৃতি ব্যাখ্যা করেন।
বদিউল আলম মজুমদার উল্লেখ করেন, “একটি ভুল বোঝাবুঝি আছে, যা দ্রুত সমাধান করা দরকার। সরকার যে অগ্রাধিকারগুলো নির্ধারণ করেছে, তার মুখে আমরা আমাদের অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে সহায়তা করার চেষ্টা করেছি, তবে সরকারী অংশ হিসেবে কাজ করিনি।” তিনি বলেন, তার দল এবং অন্যান্য আটজন সদস্য কয়েক মাস ধরে কাজ করে বিশদ রিপোর্ট ও সুপারিশ প্রস্তুত করে সরকারকে উপস্থাপন করেছে। এই প্রক্রিয়ায় তিনি কোনো পারিশ্রমিক গ্রহণ করেননি এবং তার সম্পৃক্ততা সীমিত ছিল।
নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনে কাজের সময়, বদিউল আলম মজুমদার এবং তার সহকর্মীরা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করার জন্য গবেষণা, পরামর্শ ও নীতি প্রস্তাবনা তৈরি করেন। কমিশনের কাজের শেষে তারা একটি সমন্বিত রিপোর্ট প্রস্তুত করে, যেখানে ভোটার তালিকা আপডেট, স্বতন্ত্র পর্যবেক্ষক ব্যবস্থা এবং ডিজিটাল ভোটিং মেশিনের ব্যবহার নিয়ে সুপারিশ দেওয়া হয়। যদিও এই সুপারিশগুলো সরকারের নীতি নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে, বদিউল আলম স্পষ্ট করে বলেন, তিনি কোনো সরকারি পদে নিযুক্ত ছিলেন না।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে বদিউল আলম মজুমদারকে সুজনের সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এই কমিশনের মূল লক্ষ্য ছিল বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যে ঐক্যবদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গি গঠন করা, যাতে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্তি বৃদ্ধি পায়। তবে কমিশন গঠনের প্রক্রিয়ায় বদিউল আলমের কোনো ভূমিকা ছিল না; তিনি কেবল নির্ধারিত কাজের দায়িত্ব পালন করেন। তার মতে, কমিশনের কাজের ফলাফল সরকারকে উপস্থাপন করা হলেও, তার নিজস্ব কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ছিল না।
অনুষ্ঠানের মাঝখানে বদিউল আলম হেসে বলেন, “প্রধান উপদেষ্টা (চিফ অ্যাডভাইজার) কারো সঙ্গে সরাসরি কথা বলেননি। তিনি বয়োজ্যেষ্ঠ ও অভিভাবকের ভূমিকায় আমাদেরকে দায়িত্ব দিয়েছেন।” এই মন্তব্যে তিনি সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের অভাবকে তুলে ধরেন এবং উল্লেখ করেন, যে দায়িত্বগুলো কেবল পরামর্শের মাত্রা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল।
বদিউল আলম মজুমদার সিপিডি (সেন্টার ফর পাবলিক ডেভেলপমেন্ট) এর ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের দিকে তাকিয়ে বলেন, “দেবপ্রিয়ের সম্পৃক্ততা আমার সম্পৃক্ততার সমানই।” এই তুলনা থেকে বোঝা যায়, উভয়েই কমিশনের কাজের মধ্যে সমান ভূমিকা পালন করেছেন এবং কোনো অতিরিক্ত সরকারি সুবিধা পায়নি।
অনুষ্ঠানের সমাপনী অংশে সিজিএসের সভাপতি জিল্লুর রহমান মঞ্চে উঠে বদিউল আলমের বক্তব্যের প্রতি মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, “আপনি নিজের সম্পর্কে অনেক কিছুই বলছেন, তবে আমরা জানি সত্যিকারের সঙ্গী হলে স্বর্গের মতো, আর মিথ্যা সঙ্গী হলে নরকের মতো। তাই আপনার কথাগুলোকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা দরকার।” এরপর তিনি একটি প্রবাদ ব্যবহার করে ইঙ্গিত দেন, “আপনি যত সুন্দর পোশাক পরুন না কেন, গায়ে যত সুগন্ধি লাগান না কেন, কাদা‑ময় রাস্তায় হাঁটলে শেষমেশ কাদা আপনার পায়ে লাগবে।” এই মন্তব্যগুলো বদিউল আলমের বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক বাস্তবতা ও দায়িত্বের সীমা তুলে ধরতে চেয়েছে।
বদিউল আলম মজুমদার এই স্পষ্টীকরণে ইঙ্গিত দিয়েছেন, যে ভবিষ্যতে কমিশনের কাজের ফলাফল সরকারী নীতি গঠনে প্রভাব ফেলতে পারে, তবে তিনি নিজে কোনো সরকারি পদে নিযুক্ত না থেকে স্বাধীন বিশ্লেষক ও সম্পাদক হিসেবে কাজ চালিয়ে যাবেন। তার এই অবস্থান রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার আলোকে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি সরকার ও স্বতন্ত্র সিভিল সোসাইটি সংস্থার মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের সীমানা নির্ধারণ করে।
সামগ্রিকভাবে, বদিউল আলম মজুমদার সরকারের সঙ্গে তার সীমিত সংযোগ, কমিশনের কাজের স্বচ্ছতা এবং কোনো পারিশ্রমিক না নেওয়ার বিষয়গুলো স্পষ্ট করে তুলে ধরেছেন। তার মন্তব্যগুলো রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও নীতি নির্ধারকদের জন্য একটি রেফারেন্স পয়েন্ট হিসেবে কাজ করবে, যেখানে স্বতন্ত্র সিভিল সোসাইটি সংস্থার ভূমিকা এবং সরকারের সঙ্গে তাদের সহযোগিতার সীমানা পুনরায় বিবেচনা করা হবে।



