হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW) ২০২৬ সালের বিশ্ব প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতের হিন্দু জাতীয়তাবাদী সরকার ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং সরকারের নীতি সমালোচকদের ওপর দমনমূলক পদক্ষেপ বাড়িয়ে তুলেছে। এই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০২৫ সালে সরকার ব্যাপক ঘৃণামূলক ভাষা ব্যবহার করে সংখ্যালঘুদের লক্ষ্যবস্তু করেছে।
প্রতিবেদনের ৫২৯ পৃষ্ঠার বিশদে ১০০টিরও বেশি দেশের মানবাধিকার অবস্থা বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যেখানে ভারতের নীতি ও কার্যক্রমকে বিশেষভাবে সমালোচনা করা হয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া পরিচালক এলেইন পিয়ারসন এই দিককে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের বিপরীতে রূপায়িত করেছেন। বিশ্লেষণে বিভিন্ন তথ্যসূত্র এবং 현장 조사 ব্যবহার করে নীতি‑প্রয়োগের বাস্তব প্রভাব তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকার “অবৈধ অভিবাসী” শিরোনামে শত শত বাংলা ভাষাভাষী মুসলমান এবং রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দেশ থেকে বের করে দেয়। এই পদক্ষেপকে ধর্মীয় বৈষম্য এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় দুইশতাধিক ব্যক্তি এই প্রক্রিয়ায় প্রভাবিত হয়েছে।
সমালোচকদের ওপর কঠোর দমন চালু হওয়ায় স্বাধীন মিডিয়া স্ব‑সেন্সরশিপে বাধ্য হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তাদের এবং বিজেপি সমর্থকদের হাতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা বাড়ার প্রতিবেদন রয়েছে। বিশেষ করে সংবাদ সংস্থাগুলোকে সংবেদনশীল বিষয়গুলোতে রিপোর্ট করা থেকে বিরত রাখা হয়েছে।
এলেইন পিয়ারসন উল্লেখ করেন, বৈষম্যমূলক নীতি, ঘৃণামূলক বক্তব্য এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলাগুলি সংখ্যালঘু, প্রান্তিক গোষ্ঠী এবং সমালোচকদের বিরুদ্ধে সহিংসতাকে স্বাভাবিক করে তুলেছে। তিনি বলেন, এই ধরনের পরিবেশে আইনি ব্যবস্থা প্রায়শই নির্দোষ নাগরিকদের শাস্তি দেয়। ফলে সমাজে ভয় ও অনিশ্চয়তার পরিবেশ গড়ে উঠেছে।
এই ধরনের নীতি ভারতের আন্তর্জাতিক মর্যাদা ক্ষয় করেছে, ফলে দেশের বৈশ্বিক অবস্থান দুর্বল হয়েছে বলে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বিশ্লেষণ। বেশ কয়েকটি দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় ভারতকে মানবাধিকার মানদণ্ড মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে। কিছু দেশ ইতিমধ্যে কূটনৈতিক নোটে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
বিশ্ব প্রতিবেদনটির নির্বাহী পরিচালক ফিলিপ বোলোপিয়ন বলেন, আধুনিক সময়ে কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা রোধ করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি গণতান্ত্রিক দেশ ও নাগরিক সমাজকে মৌলিক স্বাধীনতা রক্ষার জন্য কৌশলগত জোট গঠনের আহ্বান জানান। এছাড়া, আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় বাড়িয়ে মানবাধিকার রক্ষায় সমন্বিত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন।
গত বছরের এপ্রিলে জম্মু ও কাশ্মীরে পর্যটকদের ওপর গুলিবিদ্ধ হামলার পর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে চার দিনব্যাপী সশস্ত্র সংঘর্ষে রূপ নেয়। এই সংঘাতে দু’পাশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে তীব্র গুলিবর্ষণ ও বিমান হামলা ঘটে, যার ফলে বহু সৈন্য ও বেসামরিক নাগরিকের প্রাণহানি হয়। সংঘাতের পরপরই সরকার স্বাধীন গণমাধ্যমের কণ্ঠস্বর সাময়িকভাবে দমন করে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনামূলক মন্তব্যের জন্য বহু নাগরিককে গ্রেফতার করা হয় এবং শিক্ষাবিদ, ব্যঙ্গকারদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। গ্রেফতারকৃতদের অধিকাংশকে নিরাপত্তা আইন অনুযায়ী অপরাধমূলক অভিযোগে আটক করা হয়েছে। এই পদক্ষেপগুলোকে মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকতর দমন’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
হিন্দু জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীর ঘৃণামূলক বক্তব্য এবং মুসলমানদের ওপর আক্রমণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর কার্যক্রম তীব্রতর হয়েছে। কয়েকটি শহরে ধর্মীয় স্থান ও বাসস্থানে হিংসাত্মক ঘটনার রিপোর্ট পাওয়া গেছে। এই ঘটনাগুলোকে সরকার ‘শান্তি রক্ষা’ নামে ব্যাখ্যা করে।
ভারতীয় সরকার এই পদক্ষেপগুলোকে জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা এবং জনশান্তি বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনীয় বলে যুক্তি দেয়। তারা দাবি করে যে, অবৈধ অভিবাসী ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপের মোকাবিলায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সরকার এই নীতিগুলোকে সংবিধানিক অধিকার ও আইনগত কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ বলে উল্লেখ করে।
মানবাধিকার সংস্থার রিপোর্টের ফলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে সমালোচনা বাড়তে পারে, যা ভবিষ্যতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ও বাণিজ্যিক চুক্তিতে প্রভাব ফেলতে পারে। দেশের অভ্যন্তরে আসন্ন নির্বাচনের সময় এই বিষয়গুলো রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং কিছু এশীয় দেশ ইতিমধ্যে মানবাধিকার পর্যালোচনার জন্য প্রস্তাবনা পাঠিয়েছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ উল্লেখ করেছে যে, তারা ভবিষ্যতেও ভারতের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে এবং প্রাসঙ্গিক তথ্য প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক চাপ বজায় রাখবে। সংস্থা নিয়মিতভাবে সরকারকে নীতি সংশোধনের আহ্বান জানাবে এবং ভুক্তভোগীদের সুরক্ষার জন্য আইনি সহায়তা প্রদান করবে।



