চট্টগ্রাম বন্দরকে ঘিরে চলমান ধর্মঘটের ফলে বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায়, রপ্তানি খাতের চারটি প্রধান ব্যবসায়িক সমিতি প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসকে খোলা চিঠি পাঠিয়ে দ্রুত পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে।
চিঠিটি শনিবার প্রধান উপদেষ্টার অফিসে পৌঁছে, যেখানে বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্য, বাংলাদেশ নিটওয়্যার উৎপাদক ও রফতানিকার, বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশন (বিইএফ) এবং বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস এসোসিয়েশন (বিটিএমএ) একত্রে তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
সমিতিগুলো উল্লেখ করেছে যে, ধর্মঘটের ফলে বন্দর সম্পূর্ণভাবে অচল হয়ে পড়েছে এবং রপ্তানি ভিত্তিক প্রস্তুত পোশাকসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বন্দর বন্ধের ফলে দেশের রপ্তানি আয় হ্রাস পাবে বলে তারা সতর্ক করেছে, বিশেষ করে গার্মেন্টস ও নিটওয়্যার সেক্টরে ক্ষতি অপরিমেয় হতে পারে।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে বন্দর অচলাবস্থা সমাধান না হলে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ঝুঁকির মুখে পড়বে।
সমিতিগুলো interim সরকারকে রাষ্ট্রীয় সংস্কার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য প্রশংসা করে, তবে এখন পর্যন্ত প্রদর্শিত সাফল্যকে সর্বমহলে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টার প্রতি চিঠিতে বলা হয়েছে, “আপনার গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের অঙ্গীকার এখন বাস্তবায়নের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে” এবং “দেশজুড়ে গঠিত গণতান্ত্রিক উৎসবের প্রত্যাশার সঙ্গে আমরা সম্পূর্ণ একাত্মতা প্রকাশ করছি”।
বন্দরের অচলাবস্থার গভীরতা তুলে ধরে, সমিতিগুলো চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের ধারাবাহিক ধর্মঘট এবং বহির্নোঙরে কার্যক্রম বন্ধের আহ্বানকে শিল্প ও বাণিজ্যের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
তারা জোর দিয়ে বলেছে, বন্দরে কাজ করা প্রতিটি শ্রমিক ও কর্মচারী দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ সহযোদ্ধা, এবং তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য সকল পক্ষের পারস্পরিক সহমর্মিতা প্রয়োজন।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, “নির্বাচনের এই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে শিল্প, বাণিজ্য এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষসহ সব সংশ্লিষ্ট পক্ষের মধ্যে সহযোগিতার ভিত্তি গড়ে তোলা জরুরি”।
বন্দরের বহির্নোঙরে বার্থিং ও পণ্য খালাস বন্ধের ঘোষণা দেওয়ায় পুরো বন্দর অচলাবস্থার দিকে ধাবিত হয়েছে, এ কথাও সমিতিগুলো উল্লেখ করেছে।
সমিতিগুলো দেশের মোট কনটেইনারের ৯৯ শতাংশ এবং সমুদ্রপথের বাণিজ্যের ৭৮ শতাংশ এই বন্দর থেকে পরিচালিত হয় বলে উল্লেখ করে, বন্দর বন্ধের ফলে সৃষ্ট সম্ভাব্য ক্ষতির মাত্রা তুলে ধরেছে।
এই পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে, তারা সতর্ক করেছে যে বন্দর পুনরায় চালু না হওয়া পর্যন্ত রপ্তানি শৃঙ্খল ভাঙা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে শিপমেন্টের সময়সীমা বাড়তে পারে।
গার্মেন্টস ও নিটওয়্যার সেক্টরের রপ্তানি প্রতিষ্ঠানগুলো ইতিমধ্যে অর্ডার বিলম্বের মুখে, যা গ্রাহক সন্তুষ্টি ও ভবিষ্যৎ চুক্তিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
বিটিএমএ উল্লেখ করেছে, টেক্সটাইল মিলগুলোও কাঁচামাল ও পণ্য রপ্তানির জন্য বন্দর নির্ভরশীল, এবং বন্ধের ফলে উৎপাদন লাইন বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বিইএফের দৃষ্টিতে, শ্রমিকদের অধিকার রক্ষার পাশাপাশি উৎপাদন ও রপ্তানি ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি, তাই ধর্মঘটের সমাধানে সংলাপের পথ খোলা থাকা উচিত।
সমিতিগুলো সরকারের কাছে অনুরোধ করেছে, ধর্মঘটের মূল কারণগুলো দ্রুত চিহ্নিত করে সমাধানমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা, যাতে বন্দর পুনরায় সচল হয়।
এছাড়া, তারা বন্দর কর্তৃপক্ষকে শ্রমিক-নিয়োগকর্তা সংলাপের মাধ্যমে পারস্পরিক সমঝোতা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকরা পূর্বাভাস দিচ্ছেন, যদি ধর্মঘট দীর্ঘায়িত হয়, তবে গার্মেন্টস সেক্টরের রপ্তানি আয় বছরে কয়েক শত কোটি টাকা হ্রাস পেতে পারে।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বিকল্প বন্দর খোঁজার চেষ্টা করতে পারে, যা বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতার উপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, নির্বাচনের আগে বন্দর অচলাবস্থা সমাধান না হলে অর্থনৈতিক অস্থিরতা বাড়বে এবং দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন লক্ষ্যে বাধা সৃষ্টি হবে।
সমিতিগুলো সরকারকে আহ্বান জানিয়েছে, ধর্মঘটের সমাধানে সময়মত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে বন্দরকে দ্রুত সচল করা, যাতে রপ্তানি সেক্টরের ক্ষতি কমানো যায়।
প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের কাছ থেকে দ্রুত প্রতিক্রিয়া ও কার্যকরী পদক্ষেপের প্রত্যাশা প্রকাশ করা হয়েছে, যাতে দেশের অর্থনৈতিক স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব কমে।
বন্দরের অচলাবস্থা সমাধানে সকল সংশ্লিষ্ট পক্ষের সমন্বিত প্রচেষ্টা এবং সংলাপের মাধ্যমে স্থায়ী সমাধান গড়ে তোলাই এখন সময়ের দাবি, সমিতিগুলো এই বার্তায় জোর দিয়েছে।



