২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফলকে ‘আমি ও ডামি’ নির্বাচন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ভোটের দিনে মূল প্রার্থী ও প্রতিদ্বন্দ্বী উভয়ই একই দলের অন্তর্ভুক্ত ছিল, পার্থক্য কেবল নামের স্বতন্ত্রতা। ফলাফল পূর্বনির্ধারিত বলে ধারণা করা হয়, ফলে ভোটদান প্রক্রিয়া অধিকাংশ ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে রয়ে যায়।
এই নির্বাচনকে ‘ডামি’ ভোট বলা হয় কারণ ভোটের তালিকায় উপস্থিত প্রার্থীরা বাস্তবে কোনো স্বতন্ত্র রাজনৈতিক প্রোগ্রাম বা স্বাধীনতা প্রকাশ করেনি। আওয়ামী লীগের মূল প্রার্থী ও তার মিত্র দলের প্রার্থীরা একই দলীয় কাঠামোর অধীনে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নাম নথিভুক্ত হয়। ছোট দলগুলোর প্রার্থীরাও শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের মিত্র হিসেবে কাজ করে, ফলে ভোটের প্রকৃত প্রতিযোগিতা অনুপস্থিত থাকে।
২০১৪ ও ২০১৮ সালের পূর্ববর্তী দুই জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে তুলনা করলে এই প্রবণতা স্পষ্ট হয়। ২০১৪-এ ১৮-দলীয় জোটের বর্জনের পর একতরফা ভোটে আওয়ামী লীগ জয়ী হয়। ২০১৮-এ সব দল অংশগ্রহণ করলেও ভোটের আগের রাতেই ব্যালট বাক্স পূর্ণ করার অভিযোগ উঠে, যা সরকারবিরোধীরা ‘রাতের ভোট’ বলে অভিহিত করে। ২০২৪ সালের নির্বাচনও একই রকম প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা যায়।
বিরোধী শূন্য নির্বাচন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশের পর, অন্তর্বর্তী সরকার একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে। কমিশন ১২ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার কাছে তার প্রতিবেদন জমা দেয়, যেখানে তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অনিয়মের পরিকল্পনা ২০০৮ সালের ভোটের পর থেকেই শুরু হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই পরিকল্পনা সর্বোচ্চ স্তরের রাষ্ট্রিক সিদ্ধান্তের ফল এবং তা বাস্তবায়নে প্রশাসন, পুলিশ, নির্বাচন কমিশন ও গোয়েন্দা সংস্থার কিছু অংশকে ব্যবহার করা হয়েছে।
কমিশনের রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০০৮ সালের পর থেকে নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী কৌশল গড়ে তোলা হয়েছে। এই কৌশল অনুযায়ী নির্বাচনী ফলাফল নিশ্চিত করতে নির্বাচনের পূর্বে এবং পরে বিভিন্ন স্তরে হস্তক্ষেপ করা হয়। পরিকল্পনাটি উচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতৃত্বের অনুমোদন পায় এবং তা বাস্তবায়নে নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক সংস্থাগুলোর সমন্বয় প্রয়োজন হয়।
বিএনপি ২০২৩ সালে একাধিক সমাবেশ, পদযাত্রা ও অবরোধ কর্মসূচি চালু করে। দেশব্যাপী সংগঠিত এই আন্দোলনে বিশাল জনসমাবেশ দেখা যায়, যার মধ্যে ঢাকার নয়াপল্টনে ২৮ অক্টোবর অনুষ্ঠিত বৃহৎ সমাবেশও অন্তর্ভুক্ত। এই সমাবেশে বিপুল সংখ্যক সমর্থক একত্রিত হয়, তবে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড, কাঁদানে গ্যাসের শেল এবং লাঠিপেটা ব্যবহার করে সমাবেশটি ভেঙে দেয়।
পুলিশের হস্তক্ষেপের ফলে সমাবেশে উপস্থিত অনেক অংশগ্রহণকারী আহত হন এবং কিছু অংশগ্রহণকারী গৃহবন্দি হয়। নিরাপত্তা বাহিনীর এই পদক্ষেপকে সরকারবিরোধী শক্তির অশান্তি দমন হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়, তবে সমালোচকরা এটিকে গণঅধিকার লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করে।
এই ঘটনার পর রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দৃশ্যপট নিয়ে সতর্কতা প্রকাশ করছেন। ‘আমি ও ডামি’ নির্বাচনকে অবৈধভাবে পরিচালিত বলে গণ্য করা হলে, তা আওয়ামী লীগের বৈধতা ও জনসাধারণের বিশ্বাসে ক্ষতি করতে পারে। একই সঙ্গে, বিএনপি ও অন্যান্য বিরোধী দলগুলোর জন্য এই নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করে আইনি ও রাজনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণের সম্ভাবনা বাড়ছে।
অন্তর্বর্তী কমিশনের প্রতিবেদন সরকারকে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে, তা দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে। যদি নির্বাচনী অনিয়মের দায়িত্ব স্বীকার করে সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তবে ভবিষ্যৎ নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও ন্যায়পরায়ণতা নিশ্চিত করা সম্ভব। অন্যথায়, রাজনৈতিক বিরোধের তীব্রতা বাড়তে পারে এবং দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে।



