শুক্রবার বিকেলে রাজশাহী শহরের রামচন্দ্রপুর নদীর ধারের এক বস্তির মাঠে নির্বাচনী মিছির জন্য নারীরা একত্রিত হয়। মিছিতে অংশগ্রহণের জন্য প্রত্যেক নারীকে ৫০ টাকা ভাড়া দেওয়া হয়, তবে উপস্থিতি বেশি হলে এই ভাড়া ৪০ টাকায় কমে যায়। এই প্রথা নির্বাচনের সময় দীর্ঘদিন ধরে চালু আছে।
মাঠের চারপাশে ভেজা কাপড় উড়িয়ে বস্তিবাসীরা তাদের কাপড় ধুয়ে শুকাতে থাকে, আর মা‑মেয়ে জোড়া রোদে বসে চিরুনি চালাচ্ছেন। মেয়ে মাকে জিজ্ঞেস করে, “কাল মিছিতে গ্যালা ট্যাকা কই?” মা উত্তর দেন, “আইজ গেলে নাকি একসঙ্গে দিবে না।” এভাবেই মিছির জন্য নারীদের প্রস্তুতি শুরু হয়।
মিছিতে অংশগ্রহণের মূল উদ্দেশ্য হল পরিবারের জন্য অতিরিক্ত আয় অর্জন করা। যদিও ভাড়া কমে গিয়েছে, তবুও নারীরা মিছিতে যাওয়া বন্ধ করেননি। এক সপ্তাহের মধ্যে তারা ধারাবাহিকভাবে মিছিতে অংশগ্রহণ করে, প্রতিদিনের ভাড়া পেয়ে থাকে।
বস্তির বাসিন্দারা জানান, এই রকম মিছিতে অংশগ্রহণ কোনো নতুন বিষয় নয়। অতীতে যেকোনো রাজনৈতিক দলের মিছিতে টাকা দিলে নারীরা উপস্থিত হতো। বর্তমানে বিএনপি দলের মিছিতে বেশি নারীর ডাক বাড়ছে, তবে ভাড়া কমে ৪০ টাকায় সীমাবদ্ধ।
একজন প্রায় ৮০ বছর বয়সী বৃদ্ধা, যিনি রাজশাহীর বাগমারা উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন, তার সঙ্গে কথা হলো। তিনি ছোটবেলায় মা হারিয়ে শহরের এক লোকের দত্তক নেন, যার সঙ্গে বিয়ে করে বস্তিতে বসবাস করেন। স্বামী রিকশা চালাতেন, তিন বছর আগে মারা গেছেন। তার এক ছেলে ও এক মেয়ে আছে; মেয়ের বিয়ে হয়েছে, তবে জামাই নেশা করে পরিবার ছেড়ে গেছেন। মেয়ের কাজ ওষুধ কারখানায়, এবং তিনি বৃদ্ধার সঙ্গে থাকেন।
বৃদ্ধার একমাত্র সন্তান রিকশা চালান, যার চারটি ছেলে আছে, কিন্তু নিজের কাজের জন্য বাইরে যান। তাই মিছির ডাক পেলে তিনি বাধ্য হয়ে অংশ নেন। তিনি বলেন, মিছিতে যাওয়া তাদের জন্য সাময়িক আয় নিশ্চিত করে।
প্রায় ৬৫ বছর বয়সী এক পুরুষও মাঠে বসে ছিলেন, যার একটি হাত অচল। তিনি বাম হাতে অচল ডান হাতকে ম্যাসাজ করে নিজে আরাম পেতেন। তার দুই ছেলে আছে; একজন বাস চালকের সহকারী, আর অন্যজন রিকশা চালায়। ছেলেরা নিয়মিত কাজ না পায়, ফলে পরিবারের আর্থিক অবস্থা স্থিতিশীল নয়। তিনি দু’দিন মিছিতে গেছেন, তবে এখন ভাড়া ৫০ টাকার বেশি না পেয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন।
মিছিতে অংশগ্রহণকারী নারীদের সঙ্গে তার স্ত্রীও যায়; দুজনের মোট ভাড়া ১০০ টাকা হয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে মিছি আয় ধারাবাহিকভাবে কমে যাচ্ছে, এবং নগদ প্রদানও অনিয়মিত। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের সময় মিছি থেকে বেশি আয় পায়, যেখানে কাউন্সিলর ও প্রার্থীরা বেশি উপস্থিতি পায়।
একজন অংশগ্রহণকারী উল্লেখ করেন, মিছিতে ভাড়া দিয়ে ভোট দেওয়া নয়, বরং ধানের শীষে ভোট দিতে চায়। তিনি বলেন, “আমি ধানের শীষে ভোট দিতে চাই, মিছি ভাড়া শুধু আয়।” এই মন্তব্য থেকে বোঝা যায়, মিছি ও ভোটের মধ্যে সরাসরি সংযোগ নেই, তবে মিছি আয় রাজনৈতিক প্রচারণার একটি অংশ হিসেবে ব্যবহার হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, মিছিতে নারীদের অংশগ্রহণের পরিমাণ বাড়লে স্থানীয় দলগুলোর প্রভাব বাড়তে পারে। বিশেষ করে বিএনপি দল যদি বেশি নারীর সমর্থন পায়, তবে তাদের গ্রামীণ ভোটভিত্তি শক্তিশালী হতে পারে। তবে ভাড়া কমে যাওয়া এবং নগদ প্রদান অনিয়মিত হওয়া ভোটারদের মনোভাবকে প্রভাবিত করতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, রামচন্দ্রপুরের এই বস্তিতে মিছি আয় ও নারীদের অংশগ্রহণের প্রথা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভবিষ্যতে মিছি ভাড়া ও অংশগ্রহণের শর্তাবলি কীভাবে পরিবর্তিত হবে, তা স্থানীয় রাজনৈতিক গতিবিধি ও ভোটারদের আর্থিক অবস্থার উপর নির্ভরশীল থাকবে।



