চট্টগ্রাম বন্দরতে চলমান কর্মবিরতির ফলে প্রায় ১৩,০০০ কনটেইনার, যা আনুমানিক আট হাজার কোটি টাকার সমতুল্য, বর্তমানে আটকে রয়েছে; ইউরোপীয় ইউনিয়ন চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশ (ইউরোচ্যাম) এই পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
বন্দরের কার্যক্রমের স্থবিরতা ডিপি ওয়ার্ল্ডের বন্দর লিজ সিদ্ধান্তের বিরোধে সংগ্রাম পরিষদের কর্মবিরতির সরাসরি ফল। শ্রমিকদের এই প্রতিবাদে গেট, টার্মিনাল ও লোডিং এলাকা প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে, ফলে পণ্য ও কনটেইনারের চলাচল সম্পূর্ণ থেমে গেছে।
বন্দরের বন্ধের ফলে রপ্তানি সূচি ভেঙে পড়েছে; সময়মতো পণ্য পাঠাতে না পারার ফলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের অর্ডার বাতিলের ঝুঁকি বাড়ছে। একই সঙ্গে, শিপিং লাইন ও এজেন্টদের অতিরিক্ত ড্রাইভিং ও ডকিং সময়ের কারণে লজিস্টিক খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
ইউরোচ্যাম উল্লেখ করেছে যে, আট হাজার কোটি টাকার পণ্য আটকে থাকা দেশের রপ্তানি আয় এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের স্থিতিশীলতাকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এই ধরণের অপ্রত্যাশিত বাধা বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা কমিয়ে দিতে পারে।
বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম দ্রুত পুনরায় চালু করার জন্য ইউরোচ্যাম সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাছে ত্বরিত পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে। তারা শ্রমিক বিরোধের সমাধান ছাড়াও বন্দর আধুনিকায়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরেছে।
চট্টগ্রাম বন্দর দেশের মোট আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ৯০ শতাংশের বেশি পরিচালনা করে এবং রপ্তানি-নির্ভর শিল্পের প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করে। স্বাভাবিক অবস্থায় প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার থেকে দুই হাজার পাঁচশো রপ্তানি কনটেইনার হ্যান্ডল করা হয়, যা দেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ আয় নিশ্চিত করে।
বন্দরের এই অচলাবস্থা দেশের সরবরাহ শৃঙ্খলে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে; বিশেষ করে রপ্তানি-নির্ভর খাতের উৎপাদন পরিকল্পনা ও নগদ প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। লজিস্টিক খরচের বৃদ্ধি এবং ডেলিভারির দেরি সরবরাহকারীদের মুনাফা মার্জিনকে সংকুচিত করছে।
ইউরোচ্যাম উল্লেখ করেছে যে, যদি এই বিরোধ দীর্ঘমেয়াদে চলতে থাকে, তবে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের বিকল্প সরবরাহ চ্যানেল অনুসন্ধানের সম্ভাবনা বাড়বে, যা বাংলাদেশের রপ্তানি বাজারের শেয়ার হ্রাসের দিকে নিয়ে যেতে পারে। তাই দ্রুত সমাধান না হলে অর্থনৈতিক ক্ষতি আরও বাড়তে পারে।
বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম পুনরুদ্ধার এবং শ্রমিক বিরোধের সমাধানকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলে, রপ্তানি সূচি পুনরায় স্থিতিশীল হতে পারে এবং লজিস্টিক খরচের অপ্রয়োজনীয় বৃদ্ধি রোধ করা সম্ভব হবে। এই প্রক্রিয়ায় সরকার, বন্দর কর্তৃপক্ষ ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।
দীর্ঘমেয়াদে বন্দর অবকাঠামো আধুনিকায়ন, ডিজিটাল সিস্টেমের সংযোজন এবং দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে একই ধরনের অচলাবস্থার ঝুঁকি কমানো যাবে। ইউরোচ্যাম এই দিকগুলোকে দেশের প্রতিযোগিতামূলকতা বাড়ানোর মূল উপাদান হিসেবে উল্লেখ করেছে।
সারসংক্ষেপে, চট্টগ্রাম বন্দরতে বর্তমান কর্মবিরতি রপ্তানি-নির্ভর শিল্পকে সরাসরি প্রভাবিত করছে এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। দ্রুত বিরোধ সমাধান, বন্দর আধুনিকায়ন ও লজিস্টিক খরচ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এই ক্ষতি সীমিত করা সম্ভব।
স্থানীয় সূত্রের মতে, বন্দর পুনরায় চালু হলে রপ্তানি কনটেইনারের দৈনিক হ্যান্ডলিং ক্ষমতা দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের বিশ্বাস পুনরুদ্ধার হবে।



