ঢাকা—একটি জাতীয় পর্যায়ের জরিপে প্রকাশ পেয়েছে যে ভোটার ও রাজনৈতিক প্রার্থীরা অধিকাংশই উন্নয়নের ধারণাকে নতুন সড়ক, সেতু ও কুলভার নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত করে। গবেষণা পরিচালনা করেছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD), যেখানে ১,২০০ ভোটার ও ৪৫০ রাজনৈতিক প্রার্থীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলাফল অনুযায়ী ৭৬.৭ শতাংশ respondents উন্নয়নকে মূলত অবকাঠামো নির্মাণের সঙ্গে সমানভাবে যুক্ত করেন, আর ৭৭.১ শতাংশ কর্মসংস্থান নিশ্চিতকরণকে উন্নয়নের অপরিহার্য দিক হিসেবে দেখেন।
এই জরিপের তথ্য থেকে দেখা যায়, নগর এলাকায় ৮৬ শতাংশ ভোটারই উন্নয়নকে সড়ক‑সেতু নির্মাণের সঙ্গে সমানভাবে যুক্ত করেন। চট্টগ্রাম হিল ট্র্যাক্টস ও উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে এই হার ৭৯ শতাংশ, আর বারণ্ড ও অন্যান্য জলবায়ু‑ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে এই শতাংশ ৯০ থেকে ৯২ শতাংশের মধ্যে রয়ে গেছে। অর্থাৎ, পরিবেশগত ঝুঁকি বেশি থাকা এলাকায়ও অধিকাংশ মানুষ অবকাঠামোকে উন্নয়নের প্রধান সূচক হিসেবে দেখছেন।
CPD-র গবেষণা পরিচালক খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম উল্লেখ করেন, “সাধারণ মানুষ তাদের তাত্ক্ষণিক ও মৌলিক সমস্যাগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়, ফলে তারা এখনও উন্নয়নকে ঐতিহ্যবাহী অর্থে সংজ্ঞায়িত করে।” তিনি বলেন, এই প্রবণতা ভোটারদের দোষ নয়, বরং তাদের দৈনন্দিন জীবনের চাহিদা ও সীমাবদ্ধতার ফল। এই মন্তব্যটি গতকাল ঢাকা শহরে অনুষ্ঠিত জরিপ ফলাফল প্রকাশের অনুষ্ঠানে দেওয়া হয়।
প্রতিপক্ষের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, রাজনৈতিক দলগুলো সাম্প্রতিক সময়ে টেকসই উন্নয়নের কথা বেশি বলতে শুরু করেছে। তবে জরিপে দেখা যায়, প্রার্থীদের অধিকাংশই এখনও অবকাঠামো‑কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রেখেছেন। কিছু দল কিছুটা বিস্তৃত ধারণা প্রকাশ করলেও, সড়ক‑সেতু নির্মাণের ওপর জোরই প্রধান রয়ে গেছে।
CPD-র সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট হেলেন মাশিয়াত প্রেটি বলেন, “ভোটার ও রাজনৈতিক দল উভয়ই টেকসই অর্থনৈতিক বৃদ্ধিকে সমর্থন করার দাবি করে, তবু তাদের উন্নয়নের ধারণা মূলত প্রচলিত অবকাঠামো মডেলের ওপর নির্ভরশীল।” তিনি আরও যোগ করেন, এই সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশ সুরক্ষা, জলবায়ু অভিযোজন ও সামাজিক সূচকের উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে উপেক্ষা করার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এই ফলাফল রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে বেশ কিছু প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। যদি ভোটাররা প্রধানত অবকাঠামোকে উন্নয়নের মূল চিহ্ন হিসেবে দেখে, তবে রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের প্রচার ও নীতি নির্ধারণে এই প্রত্যাশা পূরণে বেশি জোর দিতে হতে পারে। অন্যদিকে, টেকসই উন্নয়নের দাবি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দলগুলোকে পরিবেশগত ও সামাজিক দিকগুলোকে সমন্বিতভাবে উপস্থাপন করতে হবে, নতুবা দীর্ঘমেয়াদী ভোটার বিশ্বাস হারানোর সম্ভাবনা থাকে।
বিশেষজ্ঞরা ইঙ্গিত করছেন, ভবিষ্যতে সরকার ও দলগুলোকে অবকাঠামো প্রকল্পের পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষার জন্য নীতি প্রণয়ন করতে হবে। জরিপের তথ্য অনুযায়ী, যদিও ৭৭.১ শতাংশ ভোটার কর্মসংস্থানকে উন্নয়নের অপরিহার্য অংশ হিসেবে দেখেন, তবু পরিবেশগত উদ্বেগের মাত্রা এখনও যথেষ্ট উচ্চ নয়। তাই, রাজনৈতিক আলোচনায় টেকসইতা ও পরিবেশ সংরক্ষণকে সমন্বিত করে একটি বিস্তৃত উন্নয়ন মডেল গড়ে তোলা জরুরি।
সারসংক্ষেপে, এই জরিপ দেখায় যে বাংলাদেশের ভোটার ও রাজনৈতিক প্রার্থীরা এখনও উন্নয়নের মূল চিত্রকে সড়ক‑সেতু নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত করে। যদিও টেকসই উন্নয়নের কথা বাড়ছে, বাস্তব ধারণা এখনও অবকাঠামো‑কেন্দ্রিক। এই বৈসাদৃশ্য রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য একটি চ্যালেঞ্জ, যা ভবিষ্যতে নীতি নির্ধারণে সমন্বিত ও বিস্তৃত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে।



