থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আজ রবিবার জাতীয় সংসদীয় নির্বাচন এবং সংবিধানিক গণভোট একসাথে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ভোটদান প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে এবং নাগরিকদের অংশগ্রহণের জন্য ভোটকেন্দ্রগুলোতে দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে। এই নির্বাচন দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে গণ্য হচ্ছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানিয়েছে, ভোটগ্রহণের সময়সূচি নির্ধারিত তারিখের চেয়ে আগে শুরু হয়েছে। নির্বাচনী কমিশনের মতে, নিরাপত্তা ও লজিস্টিক সুবিধা নিশ্চিত করতে ভোটদান আগেই চালু করা হয়েছে। ফলে ভোটারদের জন্য সময়সীমা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, যা অংশগ্রহণের হার বাড়ানোর লক্ষ্য রাখে।
আগাম ভোটের পেছনে মূল কারণ হল সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা। গত বছর দেশের শীর্ষ স্তরে একাধিক সরকারী পরিবর্তন ও আদালতের রায়ের ফলে সংসদীয় মেয়াদ অল্প সময়ের মধ্যে শেষ হতে পারে বলে অনুমান করা হয়। তাই শাসক দল দ্রুত নতুন সংসদ গঠন করে ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করতে চায়।
মে ২০২৫-এ থাইল্যান্ড ও প্রতিবেশী দেশ কম্বোডিয়ার মধ্যে সীমান্ত সংক্রান্ত উত্তেজনা বেড়ে যায়। উভয় দেশের সামরিক বাহিনীর চলাচল ও সীমান্তে সংঘর্ষের খবর আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। এই ঘটনার ফলে দু’দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের উপর চাপ বাড়ে।
জুন ২০২৫-এ থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী পায়েতোংতার্ন সিনাওয়াত্রা কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হুন সেনের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। কথোপকথনের সময় হুন সেনকে ‘আংকেল’ বলে সম্বোধন করা হয় এবং থাইল্যান্ডের নিজের সেনাবাহিনীর সমালোচনা করা হয়। এই ফোনকলের পরিণতিতে সিনাওয়াত্রার দলীয় জোটের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ে।
সিনাওয়াত্রার ফিউ থাই পার্টি, যা ভুমজাইথাই পার্টির সঙ্গে বড় জোট গঠন করেছিল, সেই জোটটি ভুমজাইথাই পার্টির প্রত্যাহারের পর ভেঙে যায়। জোটের বিচ্ছেদ শাসক দলের স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং সরকারকে অস্থির অবস্থায় ফেলে দেয়। ফলে পার্টির অভ্যন্তরে নেতৃত্বের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্রতর হয়।
আগস্ট ২০২৫-এ থাইল্যান্ডের সংবিধানিক আদালত প্রধানমন্ত্রীর নৈতিকতার লঙ্ঘন নিয়ে রায় দেয়। আদালতের সিদ্ধান্তে প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি তীব্র হয় এবং রাজনৈতিক পরিবেশ আরও উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই রায়ের ফলে সরকারকে দ্রুত নতুন সমর্থন গড়ে তুলতে হয়।
সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ সংসদের দ্বিতীয় বৃহৎ দল ভুমজাইথাই পার্টি অনুতিন চার্নভিরাকুলের নেতৃত্বে প্রোগ্রেসিভ পিপলস পার্টির সঙ্গে নতুন জোট গঠন করে। অনুতিনকে শর্তসাপেক্ষে সংসদ ভেঙে আগাম নির্বাচন আয়োজনের নির্দেশ দেওয়া হয়। এই শর্তের ফলে রাজনৈতিক দলগুলোকে দ্রুত নির্বাচনী প্রস্তুতি নিতে হয়।
এই শর্তের ভিত্তিতে নির্বাচনের তারিখ নির্ধারিত হয়েছে এবং আজ ভোটদান শুরু হয়েছে। ভোটারদের কাছে নির্বাচনের গুরুত্ব ও সংবিধানিক গণভোটের ফলাফল দেশের শাসনব্যবস্থার পুনর্গঠন নির্ধারণ করবে। নির্বাচনী কমিশন ভোটের স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত পর্যবেক্ষক নিয়োগ করেছে।
প্রতিপক্ষ দলগুলো নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে ভোটারদের সক্রিয় অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে। তারা ভোটের ফলাফলকে দেশের ভবিষ্যৎ নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হিসেবে দেখছে এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের অংশগ্রহণের পক্ষে মত প্রকাশ করেছে।
বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, নতুন সংসদ গঠনের সঙ্গে সঙ্গে থাইল্যান্ডের অভ্যন্তরীণ নীতি ও বিদেশি সম্পর্কের দিকনির্দেশে পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে কম্বোডিয়ার সঙ্গে সীমান্ত সংক্রান্ত বিষয়, নৈতিকতা সংক্রান্ত আইন ও অর্থনৈতিক সংস্কারগুলো নতুন সরকারে অগ্রাধিকার পেতে পারে। তবে নির্বাচনের ফলাফল কীভাবে রাজনৈতিক দৃশ্যপটকে পুনর্গঠন করবে তা এখনও অনিশ্চিত।
আজকের ভোটদান শেষ হওয়ার পর নির্বাচনী কমিশন ফলাফল গণনা করে পরবর্তী সপ্তাহে নতুন সংসদ গঠন ও সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করবে। গণভোটের ফলাফল সংবিধানিক পরিবর্তনের অনুমোদন বা প্রত্যাখ্যানের ভিত্তিতে দেশের আইনি কাঠামোতে প্রভাব ফেলবে। তাই থাইল্যান্ডের নাগরিক ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য এই দিনটি রাজনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হবে।



