সৌদি আরব ও সিরিয়া সম্প্রতি একাধিক বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ চুক্তি সম্পন্ন করেছে, যার আওতায় বিমান চলাচল, জ্বালানি, আবাসন ও টেলিকম সহ গুরুত্বপূর্ণ খাতে যৌথ প্রকল্প চালু হবে। এই চুক্তি সিরিয়ার ১৪ বছরব্যাপী গৃহযুদ্ধের পর অর্থনৈতিক পুনর্গঠনকে ত্বরান্বিত করার লক্ষ্য নিয়ে গৃহীত হয়েছে।
সিরিয়ান ইনভেস্টমেন্ট অথরিটির প্রধান তালাল আল-হিলালি চুক্তির মূল বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন, যার মধ্যে আলেপ্পোতে নতুন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণ, দু’টি বিদ্যমান বিমানবন্দরের আধুনিকায়ন এবং স্বল্পমূল্যের এয়ারলাইন চালু করা অন্তর্ভুক্ত। এ সব উদ্যোগের উদ্দেশ্য সিরিয়াকে আঞ্চলিক সংযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রূপান্তর করা।
সৌদি বিনিয়োগ মন্ত্রী খালিদ আল-ফালিহ উল্লেখ করেছেন যে, সদ্য গঠন করা ‘এলাফ ফান্ড’ আলেপ্পো শহরের দুটি বিমানবন্দরে প্রায় দুই বিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ৭.৫ বিলিয়ন সৌদি রিয়াল) বিনিয়োগ করবে। তহবিলের মাধ্যমে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে বৃহৎ পরিসরের অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে।
সিরিয়ার যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী আবদুলসালাম হায়কাল জানান, টেলিকম সেক্টরে প্রায় এক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। এই তহবিলের মাধ্যমে দেশের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবা এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।
সৌদি বাজেট এয়ারলাইন ফ্লাইনাস এবং সিরিয়ান সিভিল এভিয়েশন অথরিটি যৌথভাবে ‘ফ্লাইনাস সিরিয়া’ নামে একটি নতুন এয়ারলাইন প্রতিষ্ঠার চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এয়ারলাইনের ৫১ শতাংশ শেয়ার সিরিয়ার হাতে থাকবে এবং ২০২৬ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সিরিয়ার জ্বালানি মন্ত্রণালয় সৌদি আরবের SWA পাওয়ারের সঙ্গে পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এই চুক্তি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও পানির সরবরাহের অবকাঠামোকে শক্তিশালী করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিলিয়ন ডলারের এই বিনিয়োগগুলোকে সিরিয়ার পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার মূল স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। হিলালি উল্লেখ করেন, বিমান, অবকাঠামো ও টেলিকমের মতো দৈনন্দিন জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলা সেক্টরে বিনিয়োগের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রমে উত্সাহ প্রদান করা সম্ভব হবে।
সৌদি আরবের এই উদ্যোগের পেছনে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে দীর্ঘমেয়াদী শাসক বাশার আল-আসাদকে উৎখাতের পর নতুন সিরিয়ান নেতৃত্বের অন্যতম প্রধান সমর্থক হিসেবে তার কূটনৈতিক স্বার্থ রয়েছে। এই বিনিয়োগগুলোকে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের সমন্বয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সৌদি বিনিয়োগের পরিমাণ ও প্রকল্পের পরিধি সিরিয়ার আর্থিক বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন। বিমানবন্দর উন্নয়ন ও নতুন এয়ারলাইন চালু হওয়া আন্তর্জাতিক সংযোগ বাড়াবে, যা পর্যটন ও বাণিজ্যিক প্রবাহকে ত্বরান্বিত করবে।
টেলিকম সেক্টরে এক বিলিয়ন ডলারের প্রবেশের ফলে দেশের ডিজিটাল রূপান্তর দ্রুততর হবে, যা ই-কমার্স, ফিনটেক এবং স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের বিকাশে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে, অবকাঠামো প্রকল্পে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ নতুন আর্থিক মডেল গড়ে তুলতে পারে।
শক্তি ও পানি সরবরাহের চুক্তি সিরিয়ার গ্রামীণ ও নগর এলাকায় মৌলিক সেবার উন্নয়নে অবদান রাখবে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ ঘাটতি ও পানির সংকট মোকাবেলায় এই সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
সৌদি আরবের এই বহুমুখী বিনিয়োগকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিতে সিরিয়ার পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত টম ব্যারাক সামাজিক মিডিয়ায় এই চুক্তিকে সিরিয়ার পুনর্গঠন প্রচেষ্টায় কৌশলগত অংশীদারিত্ব হিসেবে প্রশংসা করেছেন।
সামগ্রিকভাবে, বিমান, জ্বালানি, টেলিকম ও আবাসন খাতে একাধিক বিলিয়ন ডলারের প্রবেশ সিরিয়ার অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে ত্বরান্বিত করবে এবং দেশের আন্তর্জাতিক অবস্থানকে পুনর্গঠন করবে। তবে প্রকল্পের বাস্তবায়ন, বেসরকারি অংশগ্রহণের শর্ত এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ, যাতে বিনিয়োগের প্রত্যাশিত ফলাফল অর্জিত হয়।



