প্রিন্স উইলিয়াম, ওয়েলসের উত্তরাধিকারী, সোমবার সাউদি আরবে তার প্রথম সরকারি সফর শুরু করেন। যুক্তরাজ্য সরকার তার অনুরোধে তিনি কোনো দ্বিধা না করে সফরে সম্মত হন। সফরটি শক্তি রূপান্তর ও যুব নীতিমালার ওপর গুরুত্বারোপ করে পরিকল্পিত।
এই সফরটি পূর্বে এস্তোনিয়া, পোল্যান্ড, ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকায় করা ভ্রমণের তুলনায় বেশি সংবেদনশীল হিসেবে বিবেচিত। পূর্বের সফরগুলো মূলত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার করার দিকে কেন্দ্রীভূত ছিল, তবে সাউদি আরবের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও মানবাধিকার সংক্রান্ত প্রশ্নগুলো অতিরিক্ত জটিলতা যোগ করেছে।
প্রিন্সের সফরের মূল বিষয়বস্তু হিসেবে শক্তি রূপান্তর, নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প এবং তরুণ প্রজন্মের ক্ষমতায়ন উল্লেখ করা হয়েছে। দু’দিনের আলোচনায় দু’দেশের সরকার এই ক্ষেত্রগুলোতে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর পরিকল্পনা করবে বলে জানানো হয়েছে। এছাড়া, যুব উদ্যোক্তা ও শিক্ষাবিদদের সঙ্গে সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে জ্ঞান বিনিময়কে উৎসাহিত করা হবে।
সাউদি আরবের বর্তমান অবস্থা ৭০ বছর আগে রাণী এলিজাবেথের সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। যদিও শাসনব্যবস্থা এখনও একনায়কত্বের রূপে রয়ে গেছে, তবে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে ধীরে ধীরে উন্মুক্ততা দেখা যাচ্ছে। তেল নির্ভরতা কমিয়ে বহুমুখী অর্থনীতির দিকে অগ্রসর হওয়া দেশের প্রধান লক্ষ্য।
অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকরণের অংশ হিসেবে সাউদি আরবের বিনোদন ও ক্রীড়া ক্ষেত্রেও নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। রিয়াদ কমেডি ফেস্টিভ্যাল, যেখানে ডেভ চ্যাপেল, কেন ভাট এবং বিল বার মতো আন্তর্জাতিক কমেডিয়ান অংশগ্রহণ করেছেন, তা দেশের সাংস্কৃতিক সংস্কারকে প্রতিফলিত করে। এছাড়া, জেদ্দায় রেড সি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব এবং ফর্মুলা ওয়ান গ্র্যান্ড প্রি অনুষ্ঠিত হয়।
সৌদি আরব ২০৩৪ সালে পুরুষ ফুটবল বিশ্বকাপের আয়োজক হতে যাচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক ক্রীড়া দৃষ্টিতে দেশের অবস্থানকে উঁচুতে নিয়ে যাবে। এই ধরনের বড় ইভেন্টগুলো দেশীয় পর্যটন ও বিনিয়োগ আকর্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে, মানবাধিকার সংস্থা, বিশেষ করে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, এই ধরনের ক্রীড়া ও বিনোদন ইভেন্টকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের মুখোশ হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগ তুলেছে। তারা উল্লেখ করে যে, সাউদি শাসন এই ইভেন্টগুলোকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেতে ব্যবহার করে, যদিও দেশীয় মানবাধিকার পরিস্থিতি এখনও উদ্বেগের বিষয়।
সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান, যাকে প্রায়ই এমবিএস নামে উল্লেখ করা হয়, প্রিন্স উইলিয়ামের সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এমবিএস দেশের বাস্তবিক নেতা হিসেবে পরিচিত এবং তার নীতি ও সিদ্ধান্তগুলো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনার বিষয়। প্রিন্স উইলিয়াম তার সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সাক্ষাৎকারের আগে প্রিন্স উইলিয়ামকে সৌদি আরবের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও মানবাধিকার পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তৃত ব্রিফিং প্রদান করা হয়েছে। এই প্রস্তুতি তাকে আলোচনার সময় সংবেদনশীল বিষয়গুলোকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করতে সহায়তা করবে। ব্রিফিংয়ে বিশেষ করে শক্তি রূপান্তর প্রকল্প এবং যুব উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে বিশদ আলোচনা অন্তর্ভুক্ত ছিল।
যুক্তরাজ্য সরকার এই সফরকে দু’দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ককে নতুন মাত্রায় নিয়ে যাওয়ার সুযোগ হিসেবে দেখছে। প্রিন্সের উপস্থিতি যুক্তরাজ্যের মধ্যপ্রাচ্য নীতি ও বাণিজ্যিক স্বার্থকে শক্তিশালী করবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। একই সঙ্গে, মানবাধিকার সংক্রান্ত উদ্বেগগুলোকে সমন্বিতভাবে মোকাবেলা করার জন্য কূটনৈতিক চ্যানেলগুলো সক্রিয় থাকবে।
সফরের পরবর্তী ধাপ হিসেবে দু’দেশের সরকার যৌথ কর্মসূচি তৈরি করবে, যার মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প, যুব প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা উদ্যোগ অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এছাড়া, মানবাধিকার সংক্রান্ত আলোচনার জন্য নির্দিষ্ট ট্র্যাক তৈরি করে ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করা হবে। প্রিন্স উইলিয়ামের এই সফর দু’দেশের ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ভিত্তি গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



