জাতীয় দৈনিকের প্রকাশিত গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, ভারত সীমান্তের নিকটবর্তী বহু কারখানা কোডিন যুক্ত সিরাপ উৎপাদন করে এবং সেগুলোকে ভিন্ন ভিন্ন বাণিজ্যিক নামের অধীনে দেশে প্রবেশ করাচ্ছে। এই সিরাপগুলো মূলত মাদকসেবার বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নজরদারি এড়াতে নাম পরিবর্তনের কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে।
গোয়েন্দা রিপোর্টে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো একাধিক ব্র্যান্ড নাম ব্যবহার করে পণ্যকে বৈধ ওষুধের ছদ্মবেশে বাজারে ছড়িয়ে দিচ্ছে। এই পদ্ধতি মাদক ব্যবসাকে গতিশীল করে তুলেছে, ফলে তারা পরিস্থিতি অনুযায়ী দ্রুত রূপান্তরিত হতে সক্ষম।
ফেনসিডিলের উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণের ফলে ঐ মাদকটির সরবরাহে উল্লেখযোগ্য হ্রাস দেখা গেলেও, কোডিন সিরাপের বিকল্প পণ্যের উৎপাদন ও বিতরণ বাড়ছে। ফলে মাদক সরবরাহের একক ধারা না থেকে পুরো একটি বাজার ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকরা সতর্কতা প্রকাশ করেছেন যে, এই সিরাপগুলোর দাম তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় প্রথমবারের ব্যবহারকারী এবং তরুণদের আকৃষ্ট করার সম্ভাবনা বাড়ছে। সস্তা মূল্যে সহজলভ্য পণ্যগুলো ব্যবহারকারী গোষ্ঠীর বিস্তৃতি দ্রুত ঘটছে।
বাজারের চাহিদা বজায় থাকলে সরবরাহকারী নতুন পথ ও পদ্ধতি খুঁজে বের করে মাদক প্রবেশ করাতে থাকে। বাংলাদেশে সীমান্তের দীর্ঘ ও জটিল প্রকৃতি, বহু প্রবেশদ্বার, ভৌগোলিক বৈচিত্র্য এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সংযোগ এই প্রবাহকে আরও সহজ করে তুলছে।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে, আইন প্রয়োগের কঠোরতা একাই সমস্যার মূল সমাধান দিতে পারে না। সীমান্তে অবৈধ পণ্য প্রবেশ রোধে গৃহীত পদক্ষেপগুলো প্রায়শই অস্থায়ী ফলাফল দেয়, কারণ অপরাধী গোষ্ঠী নতুন নাম, কম দাম এবং সহজলভ্যতা নিশ্চিত করে বিকল্প পণ্য চালু করে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা এই প্রবণতাকে সমর্থন করে। বহু দশক ধরে মাদকবিরোধী যুদ্ধের জন্য বিশাল আর্থিক সম্পদ ব্যয় করা সত্ত্বেও, মেক্সিকো থেকে আসা মাদক প্রবাহ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। উন্নত প্রযুক্তি, গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সত্ত্বেও, মাদক চক্র নতুন রূপে বাজারে প্রবেশ করতে থাকে।
এই পরিস্থিতি থেকে স্পষ্ট যে, কঠোর অভিযান কেবল অস্থায়ী সাফল্য এনে দিতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে অপরাধী গোষ্ঠী নতুন কৌশল গ্রহণ করে পুনরায় সক্রিয় হয়। তাই মাদক সমস্যার সমাধানে শুধুমাত্র আইনগত দিক নয়, সামাজিক ভিত্তিক সমস্যাগুলোর সমাধানও জরুরি।
বেকারত্ব, হতাশা, পারিবারিক ভাঙন এবং সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা প্রায়শই মানুষকে নেশার পথে ধাবিত করে। যখন সমাজে ইতিবাচক মূল্যবোধ দুর্বল হয়, তখন মাদক সহজে স্থান দখল করে। তাই সরকারকে অপরাধ দমন ছাড়াও সামাজিক পুনর্গঠন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মানসিক সহায়তা প্রদানকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
মাদক ব্যবসায়ীরা পরিকল্পিতভাবে বাজার গড়ে তোলার জন্য নতুন নাম, কম দাম এবং সহজলভ্যতা নিশ্চিত করে পণ্য বিক্রি করে। এই কৌশল ধীরে ধীরে ব্যবহারকারী গোষ্ঠীর বিস্তৃতি ঘটায় এবং নিয়ন্ত্রণকে কঠিন করে তোলে।
সম্প্রতি, সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলি এই সিরাপের উৎপাদন ও বিতরণ চেইন ভাঙার জন্য একাধিক তদন্ত চালু করেছে। তদন্তের ফলাফল অনুযায়ী, কয়েকটি কারখানা ও বিতরণ কেন্দ্রের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট মামলাগুলো স্থানীয় আদালতে শোনার জন্য নির্ধারিত হয়েছে। আদালত আগামী সপ্তাহে প্রথম শুনানি পরিচালনা করবে, যেখানে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অপরাধের প্রকৃতি ও প্রমাণ উপস্থাপন করা হবে।
অধিকন্তু, সীমান্তে মাদক প্রবাহ রোধে সমন্বিত নিরাপত্তা ব্যবস্থার পুনর্গঠন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর প্রস্তাবও সরকারী স্তরে আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এইসব উদ্যোগের সমন্বয়েই ভবিষ্যতে মাদক সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব হবে বলে বিশেষজ্ঞরা আশাবাদী।



