শিক্ষা আইন ২০২৬-এর খসড়া তাড়াতাড়ি প্রকাশ এবং দ্রুত বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্তরের ৯৯৯ শিক্ষক একত্রে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এই শিক্ষকগণ একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশে নির্বাচন‑মুখী মনোভাব এবং অন্তর্বর্তী সরকারকে স্বচ্ছ নির্বাচন নিশ্চিত করার দায়িত্বের সঙ্গে এই ত্বরিত পদক্ষেপের বৈরিতা রয়েছে।
বিবৃতিটি মূল্যবোধ আন্দোলনের মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার মুহাম্মাদ সাদাতের মাধ্যমে পাঠানো হয় এবং তাতে উল্লেখ করা হয়েছে, যখন জাতি নির্বাচন‑সংক্রান্ত প্রস্তুতিতে মনোযোগী, তখন শিক্ষা নীতির অল্প সময়ের মধ্যে পরিবর্তন করা শিক্ষাব্যবস্থার স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। শিক্ষকরা জোর দিয়ে বলেছেন, আইনটি যদি দ্রুত কার্যকর করা হয় তবে শিক্ষক, ছাত্র ও অভিভাবকদের স্বার্থের যথাযথ সমন্বয় নিশ্চিত করা কঠিন হবে।
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নতুন শিক্ষা আইনের অন্যতম মূল বৈশিষ্ট্য হল অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা এবং বৈষম্যহীন পাঠ্যক্রম। এই নীতি অনুযায়ী সকল শিক্ষার্থীকে লিঙ্গ, ধর্ম, জাতি বা সামাজিক পটভূমি নির্বিশেষে সমান শিক্ষার সুযোগ প্রদান করা হবে।
ইউনেস্কোর নথি অনুসারে, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার কেন্দ্রে লিঙ্গ সমতা রয়েছে, যা লিঙ্গ‑রূপান্তরমুখী শিক্ষাদর্শনের মাধ্যমে অর্জিত হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি লেসবিয়ান, গে, বাইসেক্সুয়াল, ট্রান্সজেন্ডার, ইন্টারসেক্স, কুইয়ার এবং নিজস্ব লিঙ্গ পরিচয় অনুসন্ধানকারী শিক্ষার্থীদের বৈচিত্র্যময় চাহিদা বিবেচনা করে।
শিক্ষকগণ স্পষ্ট করে বলেছেন, রাষ্ট্র কর্তৃক নির্ধারিত পাঠ্যক্রমে অভিভাবকদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও নৈতিক মূল্যবোধের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা আবশ্যক। কোনো শিক্ষার্থীকে এমন কোনো বিষয়ের অধ্যয়নে বাধ্য করা যাবে না, যা তার পরিবার বা ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে সরাসরি বিরোধপূর্ণ।
ধর্মীয় বা নৈতিক মতবিরোধকে মানসিক নির্যাতন বা নিগ্রহ হিসেবে গণ্য করা উচিত নয়; বরং তা শান্তিপূর্ণ সমালোচনা বা উপদেশের অধিকার হিসেবে স্বীকৃত হওয়া দরকার। এই দৃষ্টিকোণ থেকে শিক্ষকদের অনুরোধ, যে কোনো বিরোধপূর্ণ বিষয়ের ওপর আলোচনা শিক্ষকের পেশাদারিত্বের সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে।
আন্তর্জাতিক মান ও সর্বোত্তম চর্চা অনুসরণ করা অবশ্যই প্রয়োজন, তবে তা বাংলাদেশের সংবিধান, সামাজিক বাস্তবতা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। তাই পাঠ্যক্রমের বিষয়বস্তু গঠন করার সময় স্থানীয় প্রেক্ষাপটকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী শিক্ষাবিদদের মধ্যে রয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. তারেক ফজল, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. এনায়েত উল্যা পাটওয়ারী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. হাফেজ এবিএম হিজবুল্লাহ এবং যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৈয়দ মো. গালিব। এ ছাড়াও বিভিন্ন কলেজ ও উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ এই উদ্বেগে একমত হয়ে সমর্থন জানিয়েছেন।
একটি বাস্তব উদাহরণ দিয়ে বলা যায়, যদি কোনো বিদ্যালয়ে লিঙ্গ সমতা বিষয়ক পাঠ্যক্রম চালু করা হয়, তবে শিক্ষককে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সমলিঙ্গ আকর্ষণ নিয়ে আলোচনা করতে হবে। তবে যদি কোনো পরিবারের ধর্মীয় বিশ্বাস এই বিষয়কে অগ্রহণযোগ্য বলে বিবেচনা করে, তবে শিক্ষককে ঐ পরিবারের সন্তানকে ঐ বিষয় থেকে বাদ দিয়ে বিকল্প উপকরণ প্রদান করতে হবে। এভাবে ধর্মীয় সংবেদনশীলতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি দুটোই সমন্বিতভাবে পরিচালিত হতে পারে।
শিক্ষকগণ উল্লেখ করেছেন, ত্বরিত আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় শিক্ষাবিদ, অভিভাবক ও সমাজের বিস্তৃত অংশগ্রহণ নিশ্চিত না করা হলে নীতি বাস্তবায়নে বিরোধ ও অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। তাই তারা সরকারকে আহ্বান জানিয়েছেন, আইনটি পর্যালোচনা করে সকল স্টেকহোল্ডারের মতামত সংগ্রহের জন্য যথাযথ সময় ও মঞ্চ প্রদান করতে।
শিক্ষা নীতি গঠনের সময় যদি সমাজের বহুমুখী চাহিদা এবং সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতা যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি স্থিতিশীল ও ন্যায়সঙ্গত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। শেষ পর্যন্ত, পাঠকগণকে প্রশ্ন করা হচ্ছে—আপনার বিদ্যালয় বা পরিবারে অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার কোন দিকটি সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জিং বলে মনে হয়, এবং কীভাবে তা সমাধান করা যেতে পারে?



