বাংলাদেশ সরকার আগামী সোমবার মার্কিন সরকারের সঙ্গে একটি বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তুতি নিচ্ছে, যার লক্ষ্য পারস্পরিক শুল্ক কমিয়ে দু’দেশের বাণিজ্য ভারসাম্য উন্নত করা। চুক্তির অধীনে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের কাঁচামাল, বিশেষত তুলা ও সয়াবিন ব্যবহার করে তৈরি পোশাকের ওপর শুল্ক হ্রাস পাবে, এবং মার্কিন সরকারও বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হওয়া গার্মেন্টসের শুল্ক কমাবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে দু’দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করা এবং বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পের প্রতিযোগিতা বাড়ানো লক্ষ্য।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবুর রহমানের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের কাঁচামাল ব্যবহার করে তৈরি পোশাকের ওপর শুল্ক আরোপ না করা হবে, যা গার্মেন্টস রপ্তানির খরচে উল্লেখযোগ্য সাশ্রয় আনবে। একই সঙ্গে, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনও বাংলাদেশে আরোপিত পারস্পরিক শুল্কের হার আরও কমানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেছে, যদিও সুনির্দিষ্ট শতাংশ এখনও প্রকাশিত হয়নি। দুই পক্ষের এই পারস্পরিক শুল্ক হ্রাসের পরিকল্পনা গার্মেন্টস সেক্টরের জন্য বড় ধরনের আর্থিক স্বস্তি বয়ে আনবে বলে আশা করা হচ্ছে।
উদাহরণস্বরূপ, যদি কোনো টি-শার্টের মূল্যমানের ৭০ শতাংশ আমেরিকান তুলা ও সুতা দিয়ে তৈরি হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্রের কাস্টমস সেই অংশের ওপর পূর্বে আরোপিত ২০ শতাংশ শুল্ক থেকে অব্যাহতি দেবে। গার্মেন্টস শিল্পের রপ্তানি মোটের প্রায় ৯৫ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রে যায়, এবং বেশিরভাগ কারখানা তাদের পণ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ আমেরিকান কাঁচামাল ব্যবহার করে। তাই শুল্ক হ্রাসের ফলে রপ্তানি খরচ কমে, পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য প্রতিযোগিতা বাড়বে।
শুল্ক হ্রাসের প্রভাব ইতিমধ্যে দেখা যাচ্ছে; আমেরিকান তুলা ও সয়াবিনের আমদানি বাড়ছে, কারণ স্থানীয় মিলার ও ট্রেডাররা অন্যান্য দেশ থেকে ক্রয় কমিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহে রূপান্তরিত হচ্ছে। এই প্রবণতা গার্মেন্টস শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহ শৃঙ্খলকে আরও স্থিতিশীল করবে এবং দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন দক্ষতা বাড়াবে। এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশের শর্ত সহজ হওয়ায় নতুন ক্রেতা ও ব্র্যান্ডের সঙ্গে চুক্তি করার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে।
স্বাক্ষর অনুষ্ঠানটি হাইব্রিড ফরম্যাটে অনুষ্ঠিত হবে; বাণিজ্য উপদেষ্টা স্ক বশির উদ্দিন ও সচিব মাহবুবুর রহমান ভার্চুয়ালভাবে অংশ নেবেন, আর মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা ওয়াশিংটন ভ্রমণ করে সরাসরি মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। মাহবুবুর রহমান উল্লেখ করেছেন, চুক্তির নথি যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হবে, কারণ নির্বাচনের আগে সরকার মাত্র একদিনের কাজের সময় পাবে। তাই সীমিত সংখ্যক কর্মকর্তাই ভ্রমণ করতে পারবে, বাকি অংশ ডিজিটাল মাধ্যমে সম্পন্ন হবে।
এই চুক্তি গার্মেন্টস শিল্পের জন্য কাঁচামাল সরবরাহের দিক থেকে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে, এবং রপ্তানি আয় বাড়িয়ে দেশের বাণিজ্যিক ঘাটতি কমাতে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশের শর্ত সহজ হওয়ায় স্থানীয় উৎপাদনকারীরা উচ্চ মানের পণ্য তৈরি করে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে আসতে পারবে। ভবিষ্যতে শুল্ক হ্রাসের পরিমাণ বাড়লে দু’দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও গভীর হতে পারে।
চুক্তির স্বাক্ষরের পর, বাংলাদেশ সরকার শুল্ক হ্রাসের প্রয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার পরিকল্পনা করেছে, যাতে গার্মেন্টস শিল্পের উৎপাদন ও রপ্তানি সময়মতো সুবিধা পায়। এছাড়া, কাঁচামাল আমদানির পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিল্পে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে।
মার্কিন সরকারও এই চুক্তিকে দু’দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করছে, এবং ভবিষ্যতে অন্যান্য সেক্টরে পারস্পরিক সুবিধা বাড়ানোর সম্ভাবনা অনুসন্ধান করবে। উভয় পক্ষের এই সমন্বিত প্রচেষ্টা গ্লোবাল সরবরাহ শৃঙ্খলকে স্থিতিশীল করতে এবং দু’দেশের বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



