মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ৭ ফেব্রুয়ারি শনিবার বিকেলে তার মিলনায়তে ‘একাত্তরে বিবিসির সাংবাদিক মার্ক টালি স্মরণ’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করে। এই সমাবেশে মুক্তিযুদ্ধের সময় বিবিসি বাংলা সার্ভিসের প্রতিবেদন শোনার জন্য মানুষ যে প্রত্যাশা করত, তা স্মরণ করা হয়। অনুষ্ঠানটি মুক্তিযুদ্ধের আন্তর্জাতিক মিডিয়া ভূমিকা এবং মার্ক টালির ব্যক্তিগত অবদানের ওপর আলোকপাত করে।
প্রারম্ভে মার্ক টালির জীবন ও কাজের ওপর ভিত্তি করে তৈরি একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। চলচ্চিত্রের পর অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের দুইজন ট্রাস্টি, গবেষক মফিদুল হক ও সারওয়ার আলী, পাশাপাশি সাংবাদিক-যোদ্ধা হারুন হাবীব এবং প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ উপস্থিত ছিলেন। আলোচনা পর্যায়ে উপস্থিত সবাই মার্ক টালির প্রতিবেদনের ঐতিহাসিক গুরুত্বের ওপর মতবিনিময় করেন।
মার্ক টালি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় বিবিসি বাংলা সার্ভিসের মাধ্যমে যুদ্ধের বাস্তব চিত্র বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছিলেন। তার প্রতিবেদনগুলোতে গণহত্যা, নৃসংহার ও মানবিক দুর্ভোগের বিশদ বর্ণনা ছিল, যা আন্তর্জাতিক জনমত গঠন এবং রাজনৈতিক সমর্থন অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সেই সময়ে রেডিও ও টেলিভিশনের সীমিত প্রবেশাধিকার থাকায় বিবিসি বাংলা শোনার জন্য মানুষ ক্যাম্পের আশেপাশে একত্রিত হতো।
গবেষক মফিদুল হক উল্লেখ করেন, একাত্তরের দিনগুলোতে ঢাকার এক কোণাকে ‘বিবিসি বাজার’ বলা হতো, যেখানে মুক্তিযোদ্ধারা একত্রিত হয়ে ট্যালির খবরের অপেক্ষা করত। তিনি বলেন, ট্যালির সৎ ও নিরপেক্ষ রিপোর্টই তখনকার জনগণের জন্য সত্যের একমাত্র জানালার কাজ করেছিল।
সারওয়ার আলী যুক্তি দেন, মুক্তিযুদ্ধের বিজয় অসম যুদ্ধের ফল, যা আন্তর্জাতিক মিডিয়ার সঠিক তথ্য সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল ছিল। তিনি উল্লেখ করেন, ট্যালি এবং তার সহকর্মীরা যুদ্ধের নৃশংসতা ও মানবিক কষ্ট বিশ্বকে জানিয়ে আন্তর্জাতিক সমর্থন ত্বরান্বিত করতে সহায়তা করেন। আলী বলেন, ট্যালিকে সম্মান করা মানে সেই সব সাংবাদিককে সম্মান করা, যারা ঐ সময়ে সত্যকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
সামরিক ক্যাম্পে অবস্থানকালে হারুন হাবীব রেডিও শোনার অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন। তিনি জানান, বিবিসি বাংলা সার্ভিসের প্রতিবেদনগুলো যুদ্ধের অগ্রগতি ও মানবিক পরিস্থিতি সম্পর্কে একমাত্র নির্ভরযোগ্য সূত্র ছিল। হাবীবের মতে, ট্যালির রিপোর্টগুলো মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল বাড়িয়ে তুলেছিল এবং আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি গঠনে সহায়তা করেছিল।
প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফের মতে, ট্যালির নাম প্রথমবার তিনি তার বাবার মুখে শুনেছিলেন। বাবা তখন বলেছিলেন, ‘একজন লোকই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সত্য কথা বলে—তিনি হলেন মার্ক টালি’। পরে ট্যালির সঙ্গে সাক্ষাৎ করার পর, শরিফের মতে, ট্যালি নিজেই বলেছিলেন যে তিনি সত্যের সেবা করতে চেয়েছেন, যা তার কাজের মূল নীতি ছিল।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, ১৯৭১ সালের মিডিয়া কাঠামোতে বিবিসি বাংলা সার্ভিসের মতো বিদেশি সেবা দেশীয় সংঘাতকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ সেতু হিসেবে কাজ করেছে। ট্যালির রিপোর্টগুলো কেবল তথ্য সরবরাহই নয়, বরং মানবিক সহানুভূতি জাগিয়ে আন্তর্জাতিক নীতি গঠনে প্রভাব ফেলেছিল। এই ধরনের সাংবাদিকতা আজকের সংঘাতময় অঞ্চলে তথ্যের স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার রক্ষার জন্য মডেল হিসেবে বিবেচিত হয়।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের এই অনুষ্ঠানটি শুধুমাত্র অতীতের স্মরণ নয়, বরং ভবিষ্যতে মিডিয়া স্বাধীনতা ও সত্যের অনুসন্ধানকে বজায় রাখার আহ্বানও বয়ে নিয়ে এসেছে। ট্যালি এবং বিবিসি বাংলা সার্ভিসের অবদানকে স্মরণ করে নতুন প্রজন্মকে তথ্যের গুরুত্ব ও আন্তর্জাতিক দায়িত্ববোধের প্রতি সচেতন করা হচ্ছে।



