শুক্রবার সন্ধ্যায় থাকুরগাঁ শহরের জেআর কমিউনিটি সেন্টারে অনুষ্ঠিত একটি অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তিস্তা নদীর অবনতি রোধে তৎপরতা দাবি করেন। তিনি তিস্তার জন্য “মহাপরিকল্পনা” নামে একটি পরিকল্পনা প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন এবং ভারত থেকে সঠিকভাবে পানির হিসাব না পেলে নদীটি ধীরে ধীরে নিঃশেষ হবে বলে সতর্ক করেন।
মির্জা ফখরুলের মতে, তিস্তার বর্তমান অবস্থা মূলত ভারতের পানির ভাগের অমিলের ফল। তিনি উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে পানির ভাগ নির্ধারিত হলে তা সরবরাহ করা বাধ্যতামূলক, তবে ভারত এখন পর্যন্ত তা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। তাছাড়া, যখন তিস্তার পানির বিষয়টি উত্থাপিত হয়, তখন ভারতীয় সরকার প্রায়শই পশ্চিমবঙ্গের সরকারের ওপর দোষারোপ করে বিষয়টি এড়িয়ে যায়।
বক্তৃতার সময় মির্জা ফখরুল জোর দিয়ে বলেন, “যদি আমরা ভারত থেকে পানির সঠিক হিসাব পেতাম, তিস্তা এভাবে নিঃশেষ হতো না”। তিনি আরও যোগ করেন, “বিএনপি পার্টিতে তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং আমরা বিশ্বাস করি এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে তিস্তা রক্ষা করা সম্ভব”। তিস্তা রক্ষার জন্য জনগণকে জাগ্রত হতে আহ্বান জানান তিনি, “আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল তিস্তার পানির সঠিক ভাগ নিশ্চিত করা, এখনই সময় এসেছে সকলে একসাথে পদক্ষেপ নিতে”।
অনুষ্ঠানে বিএনপি নেতা আসাদুল হাবিব দুলু তিস্তা রক্ষার ওপর ভিত্তি করে রচিত “জাগো বাহে তিস্তা বাঁচাই” শীর্ষক গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করেন। বইটি তিস্তার পরিবেশগত অবস্থা, তার গুরুত্ব এবং রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় নীতি-নির্দেশনা নিয়ে বিশদভাবে আলোচনা করে। গ্রন্থ উন্মোচনের সময় দুলু বলেন, “তিস্তা আমাদের জীবনের অঙ্গ, এর সুরক্ষায় সবাইকে সক্রিয় হতে হবে”।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির রংপুর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুল হাবিব দুলু, থাকুরগাঁ জেলা বিএনপি সাধারণ সম্পাদক পয়গাম আলী এবং অন্যান্য স্থানীয় নেতাকর্মীরা। তারা মির্জা ফখরুলের বক্তব্যে একমত প্রকাশ করে তিস্তার পানির অধিকার রক্ষার জন্য পার্টির উদ্যোগকে সমর্থন জানান।
ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে তিস্তা নদীর পানির ভাগ নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের পটভূমি উল্লেখ না করে, মির্জা ফখরুল আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে ভারতের দায়িত্বের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, “প্রয়োজনমতো পানি সরবরাহ করা আন্তর্জাতিক চুক্তির অধীনে বাধ্যতামূলক, আর এখন পর্যন্ত ভারত তা পূরণ করেনি”। এদিকে, ভারতীয় পক্ষের মন্তব্য না থাকলেও পূর্বে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ভারতীয় সরকার তিস্তা পানির ভাগ নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের সরকারের ওপর দোষারোপের প্রবণতা দেখিয়েছে।
বিএনপি এই মুহূর্তে তিস্তা রক্ষার জন্য একটি সমন্বিত কৌশল গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে, যা পার্টির নীতি গঠনের অংশ হিসেবে বিবেচিত হবে। মির্জা ফখরুলের মতে, “মহাপরিকল্পনা” তিস্তার পানির বণ্টন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় জনগণের জীবিকা রক্ষার জন্য একটি সমন্বিত পদ্ধতি হবে। তিনি ভবিষ্যতে এই পরিকল্পনা নিয়ে সরকারী ও আন্তর্জাতিক স্তরে আলোচনার আশা প্রকাশ করেন।
তিস্তা নদীর অবনতি রোধে রাজনৈতিক জোট গঠন, আইনসভার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় বিধান প্রণয়ন এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিষয়টি তুলে ধরা হবে বলে পার্টি নেতারা উল্লেখ করেন। তাছাড়া, তিস্তার পরিবেশগত গুরুত্ব এবং এর ওপর নির্ভরশীল কৃষি ও মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের স্বার্থ রক্ষার জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এই উদ্যোগের ফলে তিস্তা সংক্রান্ত রাজনৈতিক আলোচনায় নতুন দৃষ্টিকোণ যোগ হবে এবং ভবিষ্যতে ভারত-বাংলাদেশের পানির ভাগ নিয়ে আলোচনায় নতুন প্রস্তাবনা উত্থাপিত হতে পারে। মির্জা ফখরুলের তিস্তা রক্ষার আহ্বান এবং “মহাপরিকল্পনা”র প্রস্তাবনা দেশের জলসম্পদ নীতি গঠনে প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে সীমান্তবর্তী নদী ব্যবস্থাপনা ও আন্তর্জাতিক জল আইনের প্রয়োগে।
বিএনপি তিস্তা রক্ষার জন্য জনসচেতনতা বৃদ্ধি, মিডিয়া প্রচার এবং স্থানীয় স্তরে কর্মসূচি চালু করার পরিকল্পনা করেছে। পার্টি নেতারা আশা করেন, তিস্তা সংক্রান্ত এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এবং পরিকল্পনা দেশের জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা নীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে এবং তিস্তার পরিবেশগত ভারসাম্য পুনরুদ্ধারে সহায়তা করবে।



